Headlines

সুন্দরবনে কুমিরের আক্রমণে নারী জেলের মৃত্যু: জীবিকার তাগিদ, বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের ন্যায্য অংশীদারিত্বের প্রশ্ন

Livelihood

Livelihood

বাগেরহাট প্রতিনিধি

বাগেরহাটের মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যালা নদীতে কুমিরের আক্রমণে সেলিনা বেগম (৫২) নামে এক নারী জেলের মৃত্যু আবারও সামনে এনে দিয়েছে বহু বছরের একটি বাস্তবতা—সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে, কিন্তু সেই বননির্ভর মানুষগুলোকেও বাঁচাতে হবে, যাদের জীবন-জীবিকা আজও এই বনের ওপর নির্ভরশীল।

বুধবার (১৭ জুন) বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটে মোংলা উপজেলার জয়মনি লঞ্চঘাটসংলগ্ন শ্যালা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সেলিনা বেগম চিলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জয়মনি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল শেখের স্ত্রী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি আরও দুই নারী জেলের সঙ্গে গলদা ও বাগদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করছিলেন। হঠাৎ একটি লোনা পানির কুমির তাকে আক্রমণ করে নদীর গভীরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সঙ্গে থাকা দুই নারী সাহসিকতার সঙ্গে জালের বাঁশ দিয়ে কুমিরটিকে আঘাত করতে থাকেন। একপর্যায়ে কুমিরটি সেলিনাকে ছেড়ে দিলেও ততক্ষণে গুরুতর আঘাত ও পানিতে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রজনন মৌসুম চলায় বনাঞ্চলে মাছ ও চিংড়ির পোনা সংগ্রহ নিষিদ্ধ। ফলে সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আইন ভঙ্গ, নাকি জীবিকার শেষ চেষ্টা?

প্রশ্ন হচ্ছে—একজন মানুষ কেন জানার পরও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেন?

উত্তরটি সুন্দরবনের আশপাশের হাজারো পরিবারের জীবনসংগ্রামে লুকিয়ে আছে।

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, সুন্দরবনের আশপাশে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের বসবাস এবং এদের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বননির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা, মধু, গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহই তাদের প্রধান আয়ের উৎস।

বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব, দারিদ্র্য এবং মৌসুমি বেকারত্ব তাদের অনেককে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও বনে যেতে বাধ্য করে।

সুন্দরবন শুধু মানুষের নয়

অন্যদিকে সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, লোনা পানির কুমির, ডলফিন, চিত্রা হরিণসহ শত শত প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল।

প্রজনন মৌসুমে কুমির ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই সময়ে মানুষের অনুপ্রবেশ মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করে।

অতএব, সংঘাতের মূল কারণ প্রাণী নয়; একই সম্পদের ওপর মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নির্ভরশীলতা।

পর্যটন কি সমাধান হতে পারে?

গত এক দশকে মোংলা ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পর্যটন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন নতুন রিসোর্ট, ইকো-কটেজ, ক্রুজ এবং পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

রিসোর্ট মালিকদের দাবি, এই শিল্প স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। স্থানীয় তরুণরা গাইড, নৌকার মাঝি, চালক, রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে।

স্থানীয় মানুষ কি শুধুই শ্রমিক হবেন, নাকি এই অর্থনীতির অংশীদারও হবেন?

শুধু চাকরি নয়, প্রয়োজন মালিকানার অংশীদারিত্ব

সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ স্থানীয় মানুষ। তাদের পূর্বপুরুষের অভিজ্ঞতা, নদীপথের জ্ঞান এবং এই অঞ্চলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কই পর্যটন শিল্পকে টিকিয়ে রাখে।

তাই নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করা উচিত—সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও পর্যটন প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অবশ্যই অংশীদার করার ব্যবস্থা করা।

এই অংশীদারিত্ব কেবল বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।

বরং স্থানীয় পরিচয়, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং বন সংরক্ষণে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিটি রিসোর্টে নির্দিষ্ট শতাংশ ইকুইটি বা লাভের অংশ স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে।

অর্থাৎ একজন স্থানীয় ব্যক্তি হয়তো অর্থ বিনিয়োগ করবেন না, কিন্তু তিনি এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসার অংশীদার হবেন এবং লাভের একটি অংশ পাবেন।

এর ফলে—

  • বন থেকে সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরতা কমবে।
  • স্থানীয় জনগণ পর্যটন শিল্পকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে দেখবেন।
  • বন সংরক্ষণে তাদের স্বার্থ সরাসরি যুক্ত হবে।
  • মানুষ ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে।
  • স্থানীয় অর্থনীতি আরও টেকসই হবে।

উন্নয়ন হবে, কিন্তু বন ধ্বংস করে নয়

রিসোর্ট নির্মাণ যদি জলাভূমি ভরাট, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, নদীদূষণ কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কারণ হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর।

তাই নতুন পর্যটন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত বহনক্ষমতা (Carrying Capacity) মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

কী হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। যেমন—

  • বননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান।
  • প্রজনন মৌসুমে সরকারি জীবিকা সহায়তা।
  • নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক সম্পদ আহরণ ব্যবস্থা।
  • স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ।
  • রিসোর্ট ব্যবসায় স্থানীয়দের বাধ্যতামূলক অংশীদারিত্ব।
  • পর্যটন আয়ের একটি অংশ স্থানীয় উন্নয়ন ও বন সংরক্ষণ তহবিলে বরাদ্দ।
  • বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগণের যৌথ ব্যবস্থাপনা (Co-management)।

সেলিনা বেগমের মৃত্যু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক।

যতদিন পর্যন্ত মানুষ জীবিকার জন্য মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে বাধ্য হবে, ততদিন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত থামবে না।

আবার, যদি স্থানীয় মানুষকে কেবল শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, অথচ সুন্দরবনকেন্দ্রিক অর্থনীতির মালিকানা ও মুনাফা বাইরের মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে এই বৈষম্যও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

সুন্দরবনকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণের দর্শক নয়, বরং অংশীদার বানানো। যখন বন বাঁচলে তাদের আয় বাড়বে, পর্যটন সফল হলে তাদেরও লাভ হবে, তখন বন রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রহরী হয়ে উঠবেন তারাই।

সেলিনা বেগমের মৃত্যু তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়ের নীতিকে নতুন করে ভাবার আহ্বান।