জাতীয় মর্যাদা ও দেশপ্রেমের আবেগকে সামনে রেখে ক্ষমতাবানদের রাজনৈতিক ইগো যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তখন তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শোষিত সাধারণ মানুষকেই।
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
দরিদ্র রাষ্ট্রে ক্ষমতার রাজনীতি শুধু অর্থনীতি, প্রশাসন কিংবা আইন দিয়ে চলে না। মানুষের আবেগও সেখানে ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বিশেষ করে ‘দেশের সম্মান’, ‘জাতীয় অপমান’, ‘দেশের শত্রু’ কিংবা ‘মাথা নত না করার’ মতো আবেগঘন ধারণাকে সামনে এনে ক্ষমতাবানরা কখনো কখনো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে একাকার করে নেন।
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ইগোকে ‘দেশের ইগো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশে এর প্রভাব আরও গভীর। যে মানুষটি নিত্যদিন দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আয় নিয়ে লড়াই করছেন, তার সামনে হঠাৎ জাতীয় মর্যাদার এমন সব প্রশ্ন হাজির করা হয়, যার উত্তেজনায় তার নিজের জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়।
এখানেই জন্ম নেয় শোষণ আড়ালের রাজনীতি।
আসিফ নজরুল–ইউনূসদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলা জরুরি— তারা যখন জাতীয় সম্মান বা অপমানের প্রশ্ন সামনে আনেন, তখন সেটি কতটা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, কতটা রাজনৈতিক অবস্থান এবং কতটা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ইগোর প্রতিফলন?
ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশকে না পাঠানোর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। সিদ্ধান্তটির প্রকৃত কারণ কী ছিল— নিরাপত্তা, কূটনীতি, রাজনৈতিক বিবেচনা নাকি অন্য কোনো কারণ— তা প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে বিচার করা উচিৎ। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তকে যদি কেবল ‘জাতীয় অপমানের জবাব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারই দুর্বল হয়ে যায়।
কারণ তখন সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা আর সিদ্ধান্তের সমালোচনা থাকে না; সেটিকে সহজেই ‘দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান’ হিসেবে দেখানো যায়।
বুদ্ধিজীবী যখন ক্ষমতার আবরণ
একটি রাষ্ট্রে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ।
বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার ভাষ্যকে আরও জোরালো করা নয়; বরং ক্ষমতাকেই প্রশ্ন করা। কিন্তু যখন কোনো বুদ্ধিজীবী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা জনপ্রিয় আবেগের সঙ্গে নিজের অবস্থানকে এমনভাবে মিলিয়ে ফেলেন যে প্রশ্নহীন আনুগত্যই তার প্রধান ভূমিকা হয়ে ওঠে, তখন তিনি আর ক্ষমতার সমালোচক থাকেন না— ক্ষমতার ভাষ্য নির্মাতায় পরিণত হন।
এই জায়গাতেই একটি বিপজ্জনক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে:
সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা উগ্রবাদকে আশ্রয় দিতে পারেন, আবার উগ্রবাদও নিজেদের বৈধতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের আশ্রয় নিতে পারে।
অবশ্য কোনো ব্যক্তি বা বুদ্ধিজীবীকে উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করার আগে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা দেখায়, চরমপন্থী রাজনীতি শুধু অস্ত্রধারী মানুষের ওপর নির্ভর করে না; তার প্রয়োজন হয় এমন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, যেখানে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা কিংবা ‘আমরাই দেশ’ ‘আমার ধর্ম’ ধরনের চিন্তাকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযান নয়। একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় সেই চিন্তারও, যা মানুষের যুক্তিবোধকে দুর্বল করে এবং রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আবেগকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে পরিণত করে।
‘দেশ’ আর ‘ক্ষমতাবান’ এক নয়
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— ক্ষমতাবান ব্যক্তি যখন নিজেকে দেশের সঙ্গে এক করে ফেলেন।
তখন তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা মানে দেশের বিরোধিতা। তার রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা মানে জাতীয় স্বার্থের বিরোধিতা। তার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন মানে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।
এটি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর একটি ফাঁদ।
কারণ দেশ কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। জাতীয় সম্মান কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইগো নয়। আর নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার কোনো সরকারের দয়া নয়।
বাংলাদেশের মানুষকে তাই ‘দেশের অপমান’ শুনলেই উত্তেজিত হওয়ার আগে জানতে হবে— কাকে অপমান করা হয়েছে, কে অপমানিত হয়েছে, সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্য কে দিচ্ছে?
কারণ দরিদ্র মানুষের ঘাড়ে ক্ষমতাবানদের ইগো চাপিয়ে দিয়ে তাকে ‘দেশপ্রেম’ বলা যায়; কিন্তু সেটিকে জনস্বার্থ বলা যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—
দেশের নামে যে ইগো তৈরি করা হচ্ছে, সেটি সত্যিই দেশের জন্য, নাকি ক্ষমতাবানদের নিজেদের জন্য?
এই প্রশ্ন করাটা এখন নাগরিক দায়িত্ব।
