Headlines

আমি সর্বস্ব মানুষঃ সন্তান কি অবতল দর্পণে সৃষ্ট নিজের স্ফিত প্রতিবিম্ব?

পৃথিবীতে সম্ভবত একমাত্র সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসা আর মালিকানাবোধকে মানুষ সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে ফেলে, সেটি হলো পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। আমরা বলি, “সন্তান আমার প্রাণ।” কিন্তু এই “আমার” শব্দটির ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় বিপদ। আমরা সন্তানকে ভালোবাসি, নাকি নিজের একটি সম্প্রসারিত সংস্করণকে ভালোবাসি?

সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই আমরা তার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই স্বপ্নগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই সন্তানের নিজের হয়। সেগুলো আমাদের অপূর্ণ স্বপ্ন, অপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণ অহংকার, অপূর্ণ জীবন। আমরা চাই সে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, বিসিএস ক্যাডার হবে, ব্যবসায়ী হবে, আমাদের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করবে, আমাদের মতো চিন্তা করবে, আমাদের মতো পৃথিবী দেখবে। যেন সে একজন স্বাধীন মানুষ নয়; বরং আমাদের দ্বিতীয় সংস্করণ।

সন্তান যেন এক অবতল দর্পণ। সেখানে আমরা নিজের মুখটিই আরও বড় করে দেখতে চাই। কিন্তু সন্তানের জন্ম কি আমাদের পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য? নাকি পৃথিবীকে নতুন একজন মানুষ উপহার দেওয়ার জন্য?

মনোবিজ্ঞানী হেইঞ্জ কোহুট (Heinz Kohut)-এর Self Psychology আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, অনেক পিতা-মাতা অজান্তেই সন্তানকে নিজের narcissistic extension, অর্থাৎ নিজের অহমের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তখন সন্তানের সাফল্য নিজের গর্ব, সন্তানের ব্যর্থতা নিজের অপমান, আর সন্তানের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে মনে হয়। ভালোবাসা তখন আর নিঃশর্ত থাকে না; ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ আনুগত্যে পরিণত হয়।

মনোবিজ্ঞানী মার্গারেট মাহলার (Margaret Mahler) বলেছিলেন, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো Separation–Individuation, অর্থাৎ ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের মানসিক ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা। আর মারে বোয়েন (Murray Bowen) দেখিয়েছেন, যে পরিবার সন্তানের এই আলাদা পরিচয়কে স্বীকার করতে পারে না, সেই পরিবারে স্বাধীনতা প্রায়ই অবাধ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন সন্তানের “আমি” পরিবারের “আমরা”-র শত্রু হয়ে ওঠে।

হয়তো এ কারণেই আমরা সন্তানকে অতিরিক্ত ভালোবাসলেও তাকে স্বাধীন হতে দিই না। আমরা অতিরিক্ত খাওয়াই, অতিরিক্ত আগলে রাখি, অতিরিক্ত শাসন করি। বাইরে থেকে এগুলো ভালোবাসা মনে হলেও, অনেক সময় এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে নিজের প্রতিচ্ছবিকে রক্ষা করার প্রবণতা। সন্তান নিজের মতো চললে মনে হয়, আয়নায় নিজের মুখ আর দেখা যাচ্ছে না। তখন কেউ কেউ আয়নাটাই ভেঙে ফেলতে চায়।

সম্প্রতি খুলনার ষোলো বছর বয়সী আরফানা হোসেন নির্জনার হত্যাকাণ্ড আমাদের সেই ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তদন্তে পুলিশ এটিকে তথাকথিত ‘অনার কিলিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পারিবারিক সংঘাতের একপর্যায়ে নির্জনা নিহত হয়। পরে তার মরদেহ বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়া হয়। আদালতে মা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন, আর অভিযুক্ত বাবা এখনো পলাতক। প্রশ্ন হলো— একজন মা কিংবা বাবা কখন এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সন্তানের জীবনের চেয়ে নিজের ধারণা, নিজের নিয়ন্ত্রণ, নিজের সম্মান বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে?

বাংলাদেশে এটি নতুন নয়। টাঙ্গাইলের পারুল আক্তারের ঘটনাও আমাদের একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। পরিবারের অমতে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন পারুল। বাবার ডাকে বিশ্বাস করে বাড়ি ফিরেছিলেন। সেই বিশ্বাসই তার মৃত্যুর কারণ হয়। তদন্তে উঠে আসে, বাবা পরিকল্পনা করে ভাড়াটে খুনির সহায়তায় তাকে হত্যা করেন, লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন, বছরের পর বছর নিজের জামাতাকে হত্যার মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসে এবং তিনি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করেন।

দুটি ঘটনা আলাদা, কিন্তু মনস্তত্ত্ব একই। এখানে হত্যা করা হয়েছে শুধু একটি মানুষকে নয়; হত্যা করা হয়েছে তার স্বাধীন পরিচয়কে। কারণ সে নিজের জীবন নিজে বেছে নিতে চেয়েছিল।

সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ু (Pierre Bourdieu) দেখিয়েছেন, সমাজে প্রতীকী ক্ষমতা (Symbolic Power) অনেক সময় অর্থনৈতিক ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। “সম্মান”, “ইজ্জত”, “বংশের মুখ”—এসবের কোনো বাজারমূল্য নেই, কিন্তু মানুষের চেতনায় এগুলোর মূল্য এত বেশি যে বাস্তব একজন মানুষের জীবনও তার কাছে ছোট হয়ে যায়। অন্যদিকে এরভিং গফম্যান (Erving Goffman) দেখিয়েছেন, মানুষ সারাজীবন সমাজের সামনে একটি গ্রহণযোগ্য পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু পরিবারে সন্তানের আচরণ সেই সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে সন্তানের প্রেম, বিয়ে কিংবা স্বাধীন সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে নয়, পরিবারের সামাজিক মুখোশে ফাটল হিসেবে দেখা হয়।

অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন পরিবারকে কখনো নিছক ভালোবাসার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখিয়েছেন, পরিবারের ভেতরেও ক্ষমতার অসম বণ্টন থাকে। যার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেশি, তার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও বেশি। ফলে অনেক সময় ভালোবাসা ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। সন্তানের ওপর কর্তৃত্ব তখন দায়িত্ব নয়, নিজের আধিপত্য রক্ষার অস্ত্র হয়ে ওঠে।

অনেকেই মনে করেন, এসব হত্যাকাণ্ড ধর্মীয় কারণে ঘটে। বাস্তবতা কিন্তু আরও জটিল। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী Aisha K. Gill-সহ বহু গবেষক দেখিয়েছেন, তথাকথিত ‘অনার কিলিং’-এর মূল শিকড় কোনো একক ধর্মে নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, বর্ণ, গোত্র, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং সম্মান-সংস্কৃতিতে। এ কারণেই একই ধরনের ঘটনা মুসলিম, হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সম্প্রদায়েই দেখা যায়। ধর্মকে অনেক সময় যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু হত্যার চালিকাশক্তি হয় সামাজিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা।

ভারতের হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ কিংবা তামিলনাড়ুতে আন্তঃজাত বা আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের কারণে অসংখ্য তরুণ-তরুণী তথাকথিত অনার কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। পাকিস্তানেও প্রতিবছর এমন বহু ঘটনা ঘটে। দেশ বদলায়, ভাষা বদলায়, ধর্ম বদলায়; কিন্তু হত্যাকারীর মনস্তত্ত্ব বদলায় না। কারণ সে বিশ্বাস করে, সন্তান একজন মানুষ নয়; সে পরিবারের সম্মানের পাত্র।

কিন্তু সম্মান কি এতই ভঙ্গুর, যে একটি মেয়ের প্রেমে পড়লেই তা ভেঙে যায়? নাকি আমাদের অহংকারই এত দুর্বল, যে সন্তানের স্বাধীনতাকে সহ্য করতে পারে না? হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা এটিই— সন্তানকে নিজের মতো বানাতে হবে না। তাকে তার নিজের মতো মানুষ হতে দিতে হবে। কারণ সন্তান কোনো প্রকল্প নয়। কোনো বিনিয়োগ নয়। কোনো সামাজিক পদক নয়। কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের যন্ত্রও নয়। সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

সন্তান কোনো প্রকল্প নয়। কোনো বিনিয়োগ নয়। কোনো সামাজিক পদক নয়। কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের যন্ত্রও নয়। সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

আমরা যদি সন্তানকে কেবল নিজের প্রতিবিম্ব হিসেবে দেখি, তাহলে পৃথিবীতে নতুন একজন মানুষের জন্ম হয় না; জন্ম হয় আমাদের আরেকটি প্রতিলিপির। আর সভ্যতা কখনো প্রতিলিপি দিয়ে এগোয় না। সভ্যতা এগিয়ে যায় তখনই, যখন একজন বাবা-মা সাহস করে বলতে পারেন— “তুমি আমার নও; তুমি তোমার। আমি শুধু তোমার পথচলার প্রথম আশ্রয়।” হয়তো সেদিনই আর কোনো নির্জনাকে বস্তাবন্দি হতে হবে না, কোনো পারুলকে বাবার ডাকে ফিরে এসে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে না। কারণ, সেদিন আমরা সন্তানকে ভালোবাসব নিজের প্রতিবিম্ব হিসেবে নয়, একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে।