একই ধরনের পণ্যে ভিন্ন কোডে করের বড় ব্যবধান, বাড়ছে শ্রেণিবিন্যাসের ঝুঁকি।
নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি করা পণ্য শনাক্ত, শ্রেণিবিন্যাস এবং শুল্ক-কর নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো Harmonized System (HS) Code। কিন্তু বাংলাদেশে এই কোডের বিপুলসংখ্যক পণ্যভিত্তিক বিভাজন, একাধিক শর্তযুক্ত উপশ্রেণি এবং কাছাকাছি পণ্যের জন্য পৃথক tariff line— শুল্কায়নকে অনেক ক্ষেত্রে জটিল করে তুলেছে।
এই জটিলতার আরেকটি দিক হলো, কাছাকাছি বর্ণনার পণ্যের মধ্যে HS Code পরিবর্তন হলে আমদানি পর্যায়ে মোট করের বোঝায় বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। ফলে পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস যেমন রাজস্ব সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভুল বা ইচ্ছাকৃত ভুল classification শুল্ক ফাঁকির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ কাস্টমসের বর্তমান Harmonised Tariff-এ পণ্য ৯৯টি অধ্যায়ের কাঠামোয় সাজানো হয়েছে। NBR-এর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামোতেও HS Code-এর description change, merge, abolish, নতুন code তৈরি এবং split-এর জন্য পৃথক তালিকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস একটি স্থির কাঠামো নয়; অর্থবছরভেদে এর পরিবর্তনও হয়।
৮ ডিজিটের কোড, কিন্তু তার ভেতরেই বহু বিভাজন
HS ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রথম ছয়টি সংখ্যা পণ্যের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ নিজস্ব tariff ও বাণিজ্যিক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও নির্দিষ্ট জাতীয় উপশ্রেণি তৈরি করে।
বাংলাদেশ কাস্টমসের operative tariff-এ যেমন 09011110 কোডে ‘Coffee, Not Roasted Or Decaffeinated’ পণ্যের জন্য আলাদা শুল্ক কাঠামো দেখা যায়। অর্থাৎ পণ্যের বর্ণনা, অবস্থা ও ব্যবহার— সবকিছু মিলিয়েই সঠিক কোড নির্ধারণ করতে হয়।
এখানেই তৈরি হয় classification-এর মূল চ্যালেঞ্জ। শুধু পণ্যের নাম দেখে HS Code নির্ধারণ করা যায় না। বাংলাদেশ Customs-এর নিজস্ব Import Export Gateway-ও স্পষ্টভাবে বলছে, সঠিক HS Code নির্ধারণে Bangladesh Customs Tariff-এর Section Note, Chapter Note, Heading Note ও Sub-heading Note, WCO Explanatory Notes এবং প্রয়োজনে WCO Classification Opinions ও Classification Decisions দেখতে হবে।
একই শ্রেণির কাছাকাছি পণ্যে করের ব্যবধান
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক Customs Tariff-এর কয়েকটি উদাহরণ বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
কাগজের ক্ষেত্রে 48025510 কোডে ECG ও ultrasonogram recording paper-এর Customs Duty ১০ শতাংশ এবং মোট করের incidence ৩৭.২৫ শতাংশ। একই heading-এর 48025590-এ অন্যান্য paper-এর Customs Duty ২৫ শতাংশ এবং মোট tax incidence ৫৮.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যই করের বোঝায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আরও একটি উদাহরণ পাওয়া যায় inorganic chemicals-এর ক্ষেত্রে। 28261910 কোডে Sodium silicon fluoride-এর Customs Duty ৫ শতাংশ এবং Total Tax Incidence ৩১.৫০ শতাংশ। বিপরীতে একই heading-এর 28261990-এ অন্যান্য পণ্যের Customs Duty ১০ শতাংশ এবং TTI ৩৭.২৫ শতাংশ।
এই পার্থক্যগুলো নিজেরাই কোনো শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ নয়। তবে এগুলো দেখায়— পণ্যের সঠিক classification কেন রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই তৈরি হয় ‘classification arbitrage’-এর ঝুঁকি
একটি পণ্যের ক্ষেত্রে যদি দুটি কাছাকাছি tariff line থাকে এবং সেগুলোর মধ্যে Customs Duty বা অন্যান্য করের বড় পার্থক্য থাকে, তাহলে ভুল classification-এর মাধ্যমে কম করের সুবিধা নেওয়ার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে।
এটি বৈধ শুল্ক সুবিধা আর অবৈধ শুল্ক ফাঁকির মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা। কোনো পণ্য সত্যিই কম শুল্কের নির্দিষ্ট HS Code-এর আওতায় পড়লে সেই সুবিধা নেওয়া আইনসঙ্গত। কিন্তু পণ্যের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য গোপন করে বা ভুল বর্ণনা দিয়ে কম শুল্কের code ব্যবহার করা হলে সেটি ভিন্ন বিষয়।
তাই কাস্টমসের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিৎ— ঘোষিত পণ্যটি বাস্তবে কোন পণ্য এবং HS-এর কোন নিয়মে সেটি শ্রেণিবদ্ধ হবে?
‘Parts’ আর পূর্ণাঙ্গ পণ্য— আরেক বড় পরীক্ষার জায়গা
যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, যানবাহন ও শিল্পকারখানার যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে classification আরও জটিল হতে পারে। কারণ একই শিল্পপণ্যের পূর্ণাঙ্গ যন্ত্র এবং তার parts/accessories-এর জন্য আলাদা tariff heading থাকতে পারে।
বাংলাদেশের Harmonised Tariff-এ Chapter 84-এ machinery and mechanical appliances এবং Chapter 85-এ electrical machinery and equipment ও তাদের parts/accessories পৃথকভাবে রাখা হয়েছে। একইভাবে Chapter 87-এ যানবাহন এবং parts ও accessories-এর আলাদা শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে।
ফলে কোনো আমদানিকারক যদি পূর্ণাঙ্গ পণ্যের পরিবর্তে তার যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করেন, সেটি সত্যিই parts হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ার শর্ত পূরণ করছে কি না— তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রতিটি CKD বা parts import-কে শুল্ক ফাঁকি বলা যাবে না। সংশ্লিষ্ট SRO, Chapter Note, Heading Note এবং পণ্যের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী classification নির্ধারণ করতে হবে।
HS Code নিয়ে নিয়মিত পরিবর্তনও তৈরি করছে নতুন চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য NBR-এর প্রকাশিত বাজেট কাঠামোতে HS Code-এর description change, merge, abolish, create new এবং split—সবগুলোর জন্য পৃথক তালিকা রয়েছে।
শুধু তাই নয়, ২০২৬ সালের জুনে NBR একাধিক নির্দিষ্ট শিল্পের জন্য নতুন বা সংশোধিত SRO জারি করেছে। এর মধ্যে lithium battery, electric vehicle, e-bike, solar energy, semiconductor, medical instrument, computer and digital device manufacturing equipment এবং textile machinery-সংক্রান্ত বিধানও রয়েছে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি ও শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে tariff classification-ও ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই অনুসন্ধানে NBR বা বাংলাদেশ Customs-এর প্রকাশিত সরকারি নথিতে ‘প্রায় ৮০০টি HS Code সবচেয়ে জটিল’—এমন কোনো সরকারি তালিকা বা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
Advanced Ruling হতে পারে বড় সমাধান
classification নিয়ে বিরোধ কমানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থা হলো Advance Ruling— অর্থাৎ পণ্য আমদানির আগেই তার tariff classification সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ।
NBR-এর নিজস্ব Customs regulatory কাঠামোতেই Advance Ruling-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে Customs-এর Import Export Gateway ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দিয়েছে যে শুধু product name দিয়ে HS Code খোঁজা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে BCT-এর বিভিন্ন Note এবং WCO-এর classification materials অনুসরণ করতে হবে।
এই ব্যবস্থা দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ব্যবহারবান্ধব হলে আমদানিকারক ও কাস্টমস— উভয়ের classification dispute কমতে পারে।
রাজস্ব সুরক্ষায় কী করা দরকার?
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার জন্য কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে—
প্রথমত, কাছাকাছি পণ্যের tariff line-গুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক শুল্ক ব্যবধান নিয়মিত পর্যালোচনা করা।
দ্বিতীয়ত, যেসব HS Code-এ বারবার classification dispute হয়, সেগুলোর জন্য প্রকাশ্য explanatory guidance তৈরি করা।
তৃতীয়ত, Advance Ruling ব্যবস্থাকে দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করা।
চতুর্থত, ঝুঁকিপূর্ণ HS Code শনাক্ত করতে Customs Risk Management System-এর ব্যবহার বাড়ানো। NBR ২০২৬ সালে Customs Risk Management Rules-ও সংশোধন করেছে।
পঞ্চমত, classification-এ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ যেখানে থাকে সেখানে নথিভিত্তিক ও audit-trail-নির্ভর সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা।
HS Code নিজে কোনো ‘শুল্ক ফাঁকির ফাঁদ’ নয়। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অপরিহার্য একটি শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা। কিন্তু একটি পণ্যের classification পরিবর্তনের সঙ্গে যদি আমদানি পর্যায়ে করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়, তাহলে সেই ব্যবস্থায় ভুল ঘোষণা, ভুল classification কিংবা ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের বর্তমান tariff কাঠামোর উদাহরণগুলো দেখাচ্ছে, একই heading-এর কাছাকাছি পণ্যেও করের ব্যবধান থাকতে পারে। তাই রাজস্ব সুরক্ষার জন্য শুধু শুল্কহার বাড়ানো নয়— কোন পণ্য কোন HS Code-এ পড়বে, সেই সিদ্ধান্তকে আরও স্পষ্ট, পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
FollowUpNews-এর অনুসন্ধানে পরবর্তী ধাপে যাচাই করা হবে— কোন কোন HS Code-এ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি classification dispute হচ্ছে, কোন code-এ duty gap সবচেয়ে বেশি এবং এসব code ব্যবহার করে বাস্তবে কোনো বড় ধরনের revenue leakage-এর নজির পাওয়া যায় কি না।
