বাংলাদেশের সামাজিক পরিসরে নতুন এক ধরনের চরিত্র ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। তারা সরাসরি উগ্রবাদী নয়, উগ্রবাদীদের সমর্থনও করে না। বরং নিজেদের শিক্ষিত, আধুনিক, প্রগতিশীল কিংবা সচেতন মানুষ হিসেবেই উপস্থাপন করে। কিন্তু তাদের কথাবার্তা ও সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—উগ্রবাদীরা যেসব বিষয়কে ঘৃণার লক্ষ্য বানায়, যেসব মানুষকে ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং যেসব জীবনধারাকে সমাজের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে, তার কিছু অংশ তারা আরও পরিশীলিত, ভদ্র এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষায় পুনরুৎপাদন করে।

পার্থক্যটা ভাষায়; প্রবণতার জায়গায় নয়।
উগ্রবাদী হয়তো প্রকাশ্যে বলবে— ‘ওরা আমাদের শত্রু।’
এই শ্রেণির মানুষটি হয়তো বলবে— ‘ওদের সংস্কৃতিটা আমাদের সমাজের জন্য উপযোগী নয়।’
উগ্রবাদী হয়তো বলবে— ‘ওদের জীবনধারা ধ্বংস করতে হবে।’
এরা বলবে— ‘সবকিছুর একটা সামাজিক সীমা থাকা দরকার।’
একজন ঘৃণাকে চিৎকার করে প্রকাশ করে, অন্যজন সেটিকে যুক্তি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কিংবা নৈতিকতার মোড়কে পরিবেশন করে।
এ কারণেই বিষয়টি আরও জটিল।
কারণ উগ্রবাদীকে চেনা সহজ। তার ভাষা আক্রমণাত্মক, তার অবস্থান প্রকাশ্য। কিন্তু পরিশীলিত অসহিষ্ণুতাকে চেনা কঠিন। সেটি আসে শিক্ষিত উচ্চারণে, সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে, কখনো হাস্যরসের মাধ্যমে, কখনো ‘আমি তো কাউকে ঘৃণা করি না, কিন্তু…’ দিয়ে।
এই ‘কিন্তু’টাই অনেক সময় আসল জায়গা।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। কারও পোশাক, ধর্মীয় পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা যৌন জীবন দেখে তার নৈতিকতা বিচার করা যায় না। একজন মানুষ কী পরেন বা ব্যক্তিগত জীবনে কী করেন— তা দিয়ে তাকে অসহিষ্ণু কিংবা সুবিধাবাদী প্রমাণ করা সম্ভব নয়। সমালোচনার বিষয় হওয়া উচিৎ তার প্রকাশ্য বক্তব্য, সামাজিক অবস্থান এবং অন্য মানুষের অধিকার সম্পর্কে তার আচরণ।
সমস্যা তখনই, যখন কেউ নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নৈতিকতার পাহারাদার হয়ে ওঠে।
নিজের জন্য আধুনিকতা, অন্যের জন্য বিধিনিষেধ।
নিজের জন্য ব্যক্তিস্বাধীনতা, অন্যের জন্য সামাজিক শাসন।
নিজের জন্য বিশ্বায়ন, অন্যের জন্য সংস্কৃতির দোহাই।
এটি আদর্শ নয়— এটি সুবিধাবাদ।
এই সুবিধাবাদের আরেকটি দিক হলো জীবনযাপনের দ্বৈত আকাঙ্ক্ষা। দেশের সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা মানুষের জীবন নিয়ে কঠোর নৈতিকতার কথা বলা হলেও ব্যক্তিগত সুযোগের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধার প্রতি তীব্র আকর্ষণ দেখা যায়।
উন্নত দেশে পড়াশোনা, চাকরি, স্থায়ী বসবাস, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা— এসব সুযোগ পেলে গ্রহণ করতে আপত্তি নেই। বরং সুযোগ তৈরি হলে সেখানেই স্থায়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও থাকে।
এখানেও সমস্যা বিদেশে যাওয়া নয়। পৃথিবীর যেকোনো দেশে গিয়ে বসবাস করা একজন মানুষের অধিকার। সমস্যা হলো মূল্যবোধের দ্বৈততা।
যে সমাজের স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসনকে নিজের সুবিধার জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই মূল্যবোধগুলো নিজ দেশে অন্যের জন্য অস্বীকার করা হচ্ছে কি না— প্রশ্নটি সেখানে।
একটি মুক্ত সমাজের সুবিধা ভোগ করতে চাইবেন, কিন্তু সেই মুক্ত সমাজের ভিত্তি— সহনশীলতা, বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘুর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ভিন্নমত সহ্য করার সংস্কৃতি— নিজের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবেন না; এই দ্বৈততা অবশ্যই প্রশ্নের দাবি রাখে।
আর এখানেই আসে মানবিক শিক্ষার প্রশ্ন।
শিক্ষিত হওয়া মানে কেবল ইংরেজিতে সাবলীল হওয়া, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মতামত দেওয়া নয়।
মানবিক শিক্ষা মানুষকে শেখায়— যে মানুষটি আমার মতো নয়, তারও সমান মর্যাদা আছে।
যে আমার ধর্ম মানে না, সে-ও মানুষ।
যে আমার মতো পোশাক পরে না, তারও স্বাধীনতা আছে।
যে আমার রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করে, তাকে ঘৃণা না করেও তার সঙ্গে তর্ক করা যায়।
যে জীবনধারা আমার পছন্দ নয়, সেটিকে আমার জীবনে গ্রহণ না করেও অন্যের জীবনে তার অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করা যায়।
এই জায়গাটিতেই প্রকৃত আধুনিকতা।
উগ্রবাদীরা সমাজে একটি ‘শত্রু’ তৈরি করতে চায়। কিন্তু শত্রু তৈরির জন্য সবসময় মিছিল, অস্ত্র কিংবা প্রকাশ্য হুমকির প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো যথেষ্ট হলো— একটি জনগোষ্ঠীকে ক্রমাগত সন্দেহের চোখে দেখা, একটি জীবনধারাকে নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট বলা, একটি মতকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা এবং ‘আমরা’ ও ‘ওরা’র মধ্যে একটি স্থায়ী দেয়াল তৈরি করা।
এই দেয়াল যদি কেউ ভদ্র ভাষায়ও তৈরি করে, সেটি দেয়ালই থাকে।
বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে এই প্রবণতা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের শক্তি এসেছে নানা ধর্ম, মত, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার মানুষের সহাবস্থান থেকে।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধও শেষ পর্যন্ত একটি মানুষের মর্যাদার লড়াই ছিলো। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, অসাম্প্রদায়িকতা কিংবা নাগরিক সমতার প্রশ্নে আপস করে কোনো আধুনিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে প্রগতিশীলতার নামেও যদি নতুন কোনো নৈতিক কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়, সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।
সমাজকে বদলাতে হলে মানুষকে দু’টি চরমতার মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে— একদিকে প্রকাশ্য উগ্রবাদ, অন্যদিকে পরিশীলিত অসহিষ্ণুতা।
আমাদের এমন মানুষ দরকার যারা ধর্ম পালন করতে পারবেন, কিন্তু ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করবেন না।
আধুনিক জীবনযাপন করবেন, কিন্তু আধুনিকতার নামে অন্যকে তুচ্ছ করবেন না।
বিদেশে যেতে চাইবেন, চাইলে সেখানেই বসবাসও করবেন— কিন্তু যে স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদ সেখানে নিজের জন্য চান, সেটিই নিজের দেশের মানুষের জন্যও চাইবেন।
নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচবেন, কিন্তু অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার নৈতিক অধিকার নিজের হাতে তুলে নেবেন না।
কারণ শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু উগ্রবাদী নয়।
আরেকটি বিপদ হলো সেই মানসিকতা, যে ঘৃণাকে ঘৃণা বলে স্বীকার করে না— বরং তাকে ধর্ম, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, ঐতিহ্য কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ভাষায় সাজিয়ে উপস্থাপন করে।
উগ্রবাদীর ভাষা হয়তো কর্কশ।
কিন্তু ঘৃণা যখন শিক্ষিত, পরিশীলিত এবং সুবিধাবাদী ভাষা পায়— তখন তাকে চেনা আরও জরুরি হয়ে পড়ে।
