সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে খবরই পায়নি ঢাকা; শ্রীলঙ্কার নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড বাতিলে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী পাঠিয়েছে কলম্বো— প্রবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে তিনি ঘটনাটিকে ‘শিক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ একই সময়ে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের সাজা বাতিলে দেশটির সরকার কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের একটি দল পাঠিয়ে আইনি লড়াই চালিয়েছে।

১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট শ্রীলঙ্কার নাগরিক আনোজন শিবরাজের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে। অন্যদিকে ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের এ বিষয়ে অবহিত করেনি। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চেয়েছে।
দু’টি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে আসে: বিদেশে নাগরিকের জীবন বিপন্ন হলে রাষ্ট্র কি আগেভাগে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, নাকি নাগরিকের মৃত্যুর পর ঘটনাটিকে অন্যদের জন্য ‘শিক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করে?
এখানে মূল প্রশ্ন সৌদি আরবের আইন মানতে হবে কিনা, তা নয়। প্রবাসীদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলতে হবে। প্রশ্ন হলো, বিচারাধীন নাগরিকের অধিকার রক্ষা, কনস্যুলার যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি ঠেকানোর সম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীল ছিল।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য: নাগরিকের জন্য শিক্ষা, রাষ্ট্রের দায় কোথায়?
১৭ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি আইন ভঙ্গ করলে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। তার বক্তব্যের সারকথা— যে দেশে নাগরিক অবস্থান করবেন, সেই দেশের আইনই প্রযোজ্য হবে। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডকে তিনি প্রবাসীদের জন্য শিক্ষা হিসেবেও উল্লেখ করেন।
কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কি শুধু বিদেশে আইন মেনে চলার উপদেশ দেওয়া?
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হলে তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে চলছে, তিনি আইনজীবী পাচ্ছেন কিনা, দোভাষীর সহায়তা পাচ্ছেন কিনা এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে কিনা— এসব বিষয়ে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত জানতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তৎপরতার প্রকাশ্য বিবরণে দেখা যাচ্ছে— নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সরকার মামলার খবর জানত না; মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করেছে।
এ অবস্থায় ঘটনাটিকে শুধু প্রবাসীদের জন্য ‘শিক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করা রাষ্ট্রের নিজস্ব দায়িত্বের প্রশ্নকে আড়াল করে। নাগরিকের আইন মানার দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি বিদেশে তার অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের কী প্রস্তুতি ছিল, সেই জবাবদিহিও জরুরি।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কী জানা গেছে?
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আখতার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে কার্যকর করা হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদে কথিত ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছিল। তদন্তের পর মামলা আদালতে যায়। আদালত অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দেন এবং তা’জির শাস্তির আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও রাজকীয় আদেশের পর সাজা কার্যকর করা হয়।
কিন্তু সরকারি বিবৃতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি:
– ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল?
– তাদের কবে গ্রেপ্তার করা হয়?
– বিচার কত দিন ধরে চলেছিল?
– তারা আইনজীবী ও আরবি ভাষার দোভাষী পেয়েছিলেন কিনা?
– আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হয়েছিল?
– তাদের পরিবার কিংবা বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে বিচার চলাকালে কোনো তথ্য জানানো হয়েছিল কিনা?
এসব তথ্য ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। দুই বাংলাদেশি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি— এমন দাবি নিশ্চিত না হলেও অনুমিত।
কিন্তু যে দুই নাগরিকের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাদের মামলার মৌলিক তথ্যই যখন তাদের নিজ দেশের সরকারের কাছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ছিল না বলে জানানো হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ ও কনস্যুলার সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শ্রীলঙ্কা যা করেছে: কূটনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে আইনি লড়াই
শ্রীলঙ্কার নাগরিক আনোজন শিবরাজ সৌদি আরবে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননাকর বলে বিবেচিত মন্তব্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী আপিলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।
এই পর্যায়ে শ্রীলঙ্কা সরকার বিষয়টিকে শুধু নাগরিকদের আইন মেনে চলার সতর্কবার্তা হিসেবে নেয়নি। দেশটির সরকার কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখে এবং বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের একটি দল সৌদি আরবে পাঠায়।
শ্রীলঙ্কার আইনজীবীরা সৌদি আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের উদ্যোগ নেন। ১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট আনোজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে। পরদিন শ্রীলঙ্কার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুণ হেমচন্দ্র বিষয়টি জানান এবং সৌদি সরকার, দেশটির রাষ্ট্রদূত, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এখানে শ্রীলঙ্কার উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাষ্ট্র কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ, নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার জীবন রক্ষার সম্ভাব্য আইনি পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করেনি।
তবে আনোজন শিবরাজ সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছেন— এমন দাবি করা যাবে না। মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে; তার মামলার পরবর্তী আইনি পরিণতি আলাদা বিষয়। তবু মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল হওয়াই তার জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি।

শ্রীলঙ্কা পারলে বাংলাদেশ কেন পারল না?
দুই দেশের মামলার অভিযোগ এক নয়, বিচারিক পরিস্থিতিও এক নয়। শ্রীলঙ্কার নাগরিকের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছিল। দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর সরকার বিষয়টি জানতে পেরেছে বলে জানিয়েছে।
এই পার্থক্যই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
শ্রীলঙ্কা তার নাগরিকের মামলায় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনজীবীদের সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কি সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের মামলা পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রেখেছে? দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পর্কে আগে কোনো তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না কেন? তাদের বিচারপ্রক্রিয়ায় কনস্যুলার যোগাযোগ বা আইনি সহায়তার সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু ‘বিদেশের আইন মেনে চলতে হবে’ বলা সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নয়।
বাংলাদেশ সরকার আগে থেকে মামলার তথ্য না পেয়ে থাকলে সেটি নিজেই তদন্তের বিষয়। আর যদি তথ্য পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে থাকে, তবে সেই ঘাটতির জবাবদিহি প্রয়োজন।
শ্রীলঙ্কার উদাহরণ প্রমাণ করে না যে বাংলাদেশ একই উদ্যোগ নিলে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড অবশ্যই ঠেকানো যেত। কিন্তু এটি দেখায়, বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া নাগরিকের জন্য কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ সেই সুযোগ পেয়েছিল কিনা, কী চেষ্টা করেছিল এবং কেন সময়মতো জানতে পারেনি— এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু নাগরিককে সতর্ক করা নয়; বিপদের সময় নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করাও। বিদেশে কোনো নাগরিক অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার অপরাধের বিচার সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী হবে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ায় তার অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখানে তিনটি ঘাটতির প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, তথ্য সংগ্রহের ঘাটতি। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সরকার ও কনস্যুলেট কিছুই জানত না বলে জানানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পর্কে আগে কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব ছিল কিনা, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নাগরিকের পক্ষে আইনি সহায়তার প্রশ্ন। তারা আইনজীবী পেয়েছিলেন কিনা, আপিলের সুযোগ ছিল কিনা এবং বাংলাদেশ কোনো পর্যায়ে সহায়তা দিতে পারত কিনা— এসব তথ্য এখনো পরিষ্কার নয়।
তৃতীয়ত, জবাবদিহির ঘাটতি। প্রতিমন্ত্রীর ‘শিক্ষা’ বক্তব্যে প্রবাসীদের সতর্ক থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ, কনস্যুলার সক্ষমতা ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা জরুরি।
দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড হলো— ঘটনার পর শুধু ব্যাখ্যা চাওয়া নয়, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো তা অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা নেওয়া।
আন্তর্জাতিক কনস্যুলার অধিকার: বাংলাদেশ কী জানতে চাইতে পারে?
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটের যোগাযোগ ও সহায়তার বিধান রয়েছে।
তবে এই বিধান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে প্রতিটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ বিদেশি সরকারকে আগাম জানানো বাধ্যতামূলক। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গ্রেপ্তার ও বিচার চলাকালে অভিযুক্তদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কিনা, তারা সহায়তা চেয়েছিলেন কিনা এবং তাদের কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কিনা।
বাংলাদেশের উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুধু অভিযোগের বিবরণ নয়, মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নথি, গ্রেপ্তারের তারিখ, রায়ের কপি, আপিলের তথ্য এবং কনস্যুলার যোগাযোগের রেকর্ড সংগ্রহের চেষ্টা করা।
এতে দুই নাগরিকের মামলায় কী ঘটেছিল তা জানা যাবে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কনস্যুলার সুরক্ষার ব্যবস্থা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের কাছে সাতটি প্রশ্ন
জনস্বার্থে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
১. দুই বাংলাদেশি কবে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তাদের বিচার কত দিন ধরে চলেছিল?
২. বাংলাদেশের কনস্যুলেট বা দূতাবাস তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পর্কে আগে কোনো তথ্য পেয়েছিল কিনা?
৩. তারা আইনজীবী, দোভাষী, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা?
৪. বাংলাদেশ সরকার আগে জানতে পারলে কোনো আইনি সহায়তা বা আপিলের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল কিনা?
৫. সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলা পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারের কী ব্যবস্থা রয়েছে?
৬. দুই নাগরিকের পরিবারকে সহায়তা, তাদের পরিচয় যাচাই এবং মরদেহ-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
৭. ভবিষ্যতে বিদেশে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হলে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, আইনজীবী নিয়োগ ও কূটনৈতিক যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
নাগরিকের জন্য শিক্ষা, নাকি রাষ্ট্রেরও শিক্ষা নেওয়ার সময়?
বিদেশে আইন মেনে চলা প্রত্যেক বাংলাদেশির দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বের কথা বলে রাষ্ট্রের নিজস্ব দায়িত্বকে ছোট করা যায় না। বিদেশে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাঁর ন্যায়বিচার, আইনি সহায়তা এবং কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা তার নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্ত করেছে। বাংলাদেশ দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিষয়টি জানত না বলে জানিয়েছে। এই ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধান করা এখন জরুরি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রবাসীদের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে জনগণ আরও স্পষ্ট জবাব প্রত্যাশা করে। কেন সরকার আগে জানতে পারেনি? কী ধরনের কনস্যুলার ব্যবস্থা ছিল? নাগরিকদের পক্ষে কী করা সম্ভব ছিল? এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হবে?
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার পর তাদের জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের বিচারপ্রক্রিয়ার সত্য উদ্ঘাটন, পরিবারকে সহায়তা এবং ভবিষ্যতে অন্য নাগরিকদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রবাসীকে শুধু আইন মেনে চলার শিক্ষা দেওয়া সহজ; বিপদের সময় তার পাশে দাঁড়ানোর মতো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলাই প্রকৃত দায়িত্ব। শ্রীলঙ্কার ঘটনা সেই দায়িত্ব পালনের একটি উদাহরণ সামনে এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন প্রশ্ন— রাষ্ট্র কি নিজের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করে শিক্ষা নেবে, নাকি নাগরিকদের সতর্ক করেই দায়িত্ব শেষ করবে?
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৭ অক্টোবর ২০২৬; দ্য ডেইলি স্টার, ১৫–১৮ অক্টোবর ২০২৬; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস), ১৭ অক্টোবর ২০২৬; শ্রীলঙ্কা সরকারের সরকারি সংবাদ পোর্টাল, ১৪ অক্টোবর ২০২৬; শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিরর, ১৪ অক্টোবর ২০২৬।
