সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া একজন কর্মকর্তার কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি জবাবদিহির প্রশ্নের সমাপ্তি ঘটায় না। বরং সরকারি দায়িত্ব পালনকালে যদি অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে অবসরের পরও তার তদন্ত, বিচার এবং অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের আইনি সুযোগ বিদ্যমান। আইনের চোখে সরকারি পদ হারানো দায়মুক্তির সমার্থক নয়।

সম্প্রতি অবসরে গেছেন সাব-রেজিস্টার থেকে পদোন্নতি পেয়ে জেলা রেজিস্টার হওয়া কর্মকর্তা সাবিকুন নাহার। চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি ঢাকার আশপাশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, গুলশান, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঢাকা জেলার জেলা রেজিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ লক্ষ্মীপুর জেলার জেলা রেজিস্টার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
ভূমি ও দলিল নিবন্ধন খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি নগদ অর্থ লেনদেন হওয়া সরকারি সেবাগুলোর একটি। দলিল নিবন্ধনের সঙ্গে স্ট্যাম্প শুল্ক, নিবন্ধন ফি, উৎসে কর, ভ্যাট এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ফি জড়িত। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই খাতে অনিয়ম, দালালচক্র, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
সরকারি বেতনের কাঠামো বিবেচনায় একজন সাব-রেজিস্টার বা জেলা রেজিস্টারের আয় নির্ধারিত। দীর্ঘ চাকরি শেষে বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও বৈধ সঞ্চয়ের মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারেন— এটি স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন একজন কর্মকর্তার জীবনযাপন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট, বিপুল জমি কিংবা বিপুল বিনিয়োগ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ ওঠে। তখন সেটি শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় তদন্তের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে দুর্নীতির মামলায় বহুবার দেখা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন এবং প্রচলিত ফৌজদারি আইনের আওতায় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান, মামলা ও সম্পদ জব্দের আইনি সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ অবসর কোনোভাবেই দায়মুক্তির ঢাল নয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা নষ্ট হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন— সারা জীবন সরকারি দায়িত্ব পালন করে একজন কর্মকর্তা এমন সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অথচ অবসরের পর আর কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর বার্তা দিতে হলে শুধু কর্মরত কর্মকর্তা নয়, অবসরপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তবে তদন্তেই তা স্পষ্ট হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনি স্বস্তি পাবেন। আবার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রের উচিত অবৈধ সম্পদ উদ্ধার, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং জনগণের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল ছোটখাটো ঘুষ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে সেটি প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে সৎ কর্মকর্তারাও হতাশ হন এবং জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়।
সাবিকুন নাহারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে তার সম্পদ, জীবনযাপন এবং দায়িত্ব পালনকে ঘিরে নানা অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের চূড়ান্ত তদন্ত ও বিচারিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে অভিযোগের সত্যতা কতটুকু। তাই জনস্বার্থে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান।
রাষ্ট্রের সামনে আজ বড় প্রশ্ন হলো— সরকারি চাকরি শেষ হলেই কি জবাবদিহিও শেষ হয়ে যাবে? নাকি জনগণের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে অবসরের বহু বছর পরও আইনের শাসন সমানভাবে কার্যকর হবে?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে একটি নীতি প্রতিষ্ঠা জরুরি— চাকরি শেষ হতে পারে, কিন্তু জবাবদিহি শেষ হয় না। অবসর একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া; এটি কখনোই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয় মুক্তির সনদ হতে পারে না। জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র প্রত্যেক অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করবে এবং প্রমাণিত হলে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করবে—তিনি কর্মরত কর্মকর্তা হোন বা অবসরপ্রাপ্ত।
