Headlines

পর্ব–২: নদীর বুকে ভাসছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ—আমরা কি তা দেখতে পাচ্ছি?

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ

লেখক: FollowUpNews Research Desk

“নদী শুধু একটি জলধারা নয়; একটি জাতির ইতিহাস, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের ধারক।”

বাংলাদেশের দিকে যদি আকাশ থেকে তাকানো যায়, তাহলে মনে হবে সবুজ এক ভূখণ্ডের বুক চিরে অসংখ্য নীল শিরা-উপশিরা বয়ে চলেছে। এই নদীগুলোই হাজার হাজার বছর ধরে হিমালয় থেকে পলি এনে পৃথিবীর অন্যতম উর্বর বদ্বীপ গড়ে তুলেছে। এই নদীগুলোই আমাদের কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, জনপদ সৃষ্টি করেছে, বাণিজ্যের পথ খুলেছে এবং একটি স্বতন্ত্র সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশ নদীর জন্য যুদ্ধ করে, আর আমরা এমন একটি দেশে জন্মেছি যেখানে নদী নিজেই আমাদের কাছে এসেছে।

তবুও আজ একটি প্রশ্ন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে— যে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ নদী, সেই দেশের অর্থনীতিতে নদীর অবদান এত সীমিত কেন?

এক সময় বাংলাদেশের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীপথ। ধান, পাট, লবণ, কাঠ, মসলা, সবকিছুই নৌপথে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পৌঁছে যেত। নদী ছিল সবচেয়ে সস্তা, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু উন্নয়নের নামে আমরা ধীরে ধীরে নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। নদী দখল হয়েছে, ভরাট হয়েছে, দূষিত হয়েছে। অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে। অনেক নদী এখন শুধু মানচিত্রে আছে, বাস্তবে নেই। অথচ নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে দেশের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, কৃষি আরও উৎপাদনশীল হতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নতুন গতি পেতে পারে।

নদীর মতোই পানি বাংলাদেশের আরেকটি অবমূল্যায়িত সম্পদ। পৃথিবীর বহু দেশ যখন নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছে, তখন বাংলাদেশ বর্ষায় অতিরিক্ত পানি আর শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতির দুই বিপরীত সমস্যার মুখোমুখি। বাস্তবে সংকট পানির নয়; সংকট পরিকল্পনার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার, জলাধার নির্মাণ, খাল সংস্কার এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যভাণ্ডারে পরিণত হতে পারে। বন্যাকেও আমরা কেবল দুর্যোগ হিসেবে দেখি। অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনায় বন্যার পানি কৃষিজমির উর্বরতা বাড়াতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এরপর আসে বঙ্গোপসাগরের কথা। আমরা সমুদ্রকে প্রায়ই পর্যটনের চোখে দেখি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে সমুদ্র শুধু সৈকত নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে বিশাল সামুদ্রিক এলাকা পেয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। সামুদ্রিক মাছ, গভীর সমুদ্রের সম্ভাব্য জ্বালানি, সামুদ্রিক শৈবাল, জৈবপ্রযুক্তি, অফশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প, এসবই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী অর্থনীতির নতুন ভিত্তি। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এখনও এই সম্পদগুলোর পূর্ণ ব্যবহার করতে পারিনি?

এর একটি বড় উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের শিক্ষা ও চিন্তার জগতে। যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে না, গবেষণাকে গুরুত্ব দেয় না এবং বিজ্ঞানকে জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে না, সেই সমাজ প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও সেগুলোকে সম্পদে রূপান্তর করতে পারে না। নদীকে বুঝতে জলবিদ্যা জানতে হয়, সমুদ্রকে কাজে লাগাতে সামুদ্রিক বিজ্ঞান জানতে হয়, কৃষিকে আধুনিক করতে জীবপ্রযুক্তি জানতে হয়। এগুলোর কোনোটিই শুধু মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা এবং আত্মিক শক্তি দিতে পারে। কিন্তু যখন সমাজে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয় যে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত, ভাষা শিক্ষা কিংবা গবেষণার চেয়ে সংকীর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন জাতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। ধর্মান্ধতা কখনোই জ্ঞান সৃষ্টি করে না; বরং প্রশ্ন করার সাহসকে সংকুচিত করে। একটি শিশুর হাতে  ধর্মগ্রন্থ থাকা কেনো গুরুত্বপূর্ণ? কিন্তু তার হাতে বিজ্ঞান বই, গণিতের খাতা, কম্পিউটার এবং গবেষণার সুযোগ থাকা জরুরি। কারণ আগামী পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা হবে জ্ঞান, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের।

আজ বাংলাদেশের বহু পরিবার তাদের সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পাঠাচ্ছেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার। কিন্তু যদি কোনো শিশুর শিক্ষা বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, ভাষা ও সমালোচনামূলক চিন্তার পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, একটি জাতিও ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে ধর্মীয় (নৈতিক) মূল্যবোধ এবং আধুনিক বিজ্ঞান একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা নেদারল্যান্ডস, তাদের কারও কাছে বাংলাদেশের মতো এত নদী নেই, এত উর্বর ভূমি নেই কিংবা এত বড় তরুণ জনগোষ্ঠীও নেই। কিন্তু তারা শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। তারা এমন নাগরিক তৈরি করেছে, যারা প্রশ্ন করতে জানে, গবেষণা করতে জানে, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে জানে এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে। সেই কারণেই সীমিত সম্পদ নিয়েও তারা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে এখনও সুযোগ আছে। আমাদের নদীগুলোকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পানিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরকে ব্লু ইকোনমির কেন্দ্র বানানো সম্ভব। কিন্তু এর জন্য শুধু প্রকল্প বা অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং এমন একটি সমাজ, যেখানে কুসংস্কারের চেয়ে যুক্তি, অন্ধ অনুসরণের চেয়ে অনুসন্ধিৎসা এবং বিভেদের চেয়ে জ্ঞানকে বেশি মূল্য দেওয়া হবে।

বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করার চাবিকাঠি হয়তো আমাদের হাতেই রয়েছে। সেই চাবির নাম নদী, পানি, সমুদ্র এবং জ্ঞান। প্রশ্ন শুধু একটাই— আমরা কি সেই দরজা খুলতে প্রস্তুত?


পর্ব–১: পৃথিবীর অন্যতম সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র বাংলাদেশ—তবুও কেন আমরা সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারিনি?