একই সঙ্গে, ডিজিটাল বিপ্লবের ঢেউয়ে ভেসে ভারত দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বাজারে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এই দুই “সবুজ” ও “স্মার্ট” উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অভিন্ন সংকট—জল।
এই উন্নয়ন কি সত্যিই টেকসই, নাকি আমরা অদৃশ্যভাবে ভবিষ্যতের জলসম্পদ বন্ধক রাখছি?

ইথানল: সবুজ জ্বালানি নাকি ‘ভার্চুয়াল ওয়াটার’ সংকট?
ভারতের ইথানল উৎপাদন মূলত কৃষিভিত্তিক— ধান, আখ এবং ভুট্টা এর প্রধান উৎস। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে পেট্রোলে ২০% ইথানল মিশ্রণ (E20) নিশ্চিত করা হবে।
কিন্তু সমস্যাটি এখানেই। ইথানল আসলে “ভার্চুয়াল ওয়াটার” বহন করে, অর্থাৎ উৎপাদনের পেছনে বিপুল জল ব্যবহৃত হয়।
-
ধান থেকে ১ লিটার ইথানল উৎপাদনে প্রায় ১০,০০০–১১,০০০ লিটার জল;
-
আখ থেকে প্রায় ৩,০০০–৪,০০০ লিটার জল।
এই জল সরাসরি কারখানায় নয়, বরং ফসল চাষের সময় ভূগর্ভস্থ জল থেকে তোলা হয়।
জল-সংকটপূর্ণ অঞ্চলে জ্বালানি উৎপাদন
সমস্যা আরো জটিল হয় যখন দেখা যায় ইথানল উৎপাদনের কেন্দ্রগুলো যেমন মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটক—নিজেরাই দীর্ঘদিন ধরে খরাপ্রবণ অঞ্চল।
এখানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়:
-
কৃষক পানির অভাবে ফসল ফলাতে পারেন না;
-
কিন্তু একই এলাকায় শিল্প কারখানা ভূগর্ভস্থ জল তুলে ইথানল তৈরি করছে।
এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সম্পদ বণ্টনের একটি গভীর সামাজিক বৈষম্য।
খাদ্য বনাম জ্বালানি: একটি নীরব সংঘাত
ইথানল উৎপাদনে খাদ্যশস্য ব্যবহারের ফলে খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ভারতে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার (PDS) জন্য সংরক্ষিত চালের একটি অংশ এখন ডিস্টিলারিগুলোতে যাচ্ছে। এর ফলেঃ
-
দরিদ্র মানুষের খাদ্য সরবরাহ কমছে;
-
খাদ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে জ্বালানি, এই দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে আরো তীব্র হতে পারে।
দূষণঃ জলের আরেক শত্রু
ইথানল উৎপাদনের পর যে বর্জ্য তৈরি হয়— যাকে “স্পেন্ট ওয়াশ” বলা হয়, তা অত্যন্ত দূষণকারী।
যদি এটি যথাযথভাবে শোধন না করা হয়, তাহলেঃ
-
মাটির উর্বরতা কমে যায়;
-
ভূগর্ভস্থ জল দূষিত হয়;
-
স্থানীয় মানুষের পানীয় জল ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, শুধু জল খরচই নয়, জল নষ্টও হচ্ছে।
ডিজিটাল উন্নয়ন ও ‘ডেটা সেন্টারের তৃষ্ণা’
আমরা যখন এআই ব্যবহার করি, তখন তার পেছনের বাস্তবতা আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এই প্রযুক্তির অবকাঠামো ডেটা সেন্টার অত্যন্ত জলনির্ভর।
কেন এত জল লাগে?
ডেটা সেন্টারের হাজার হাজার সার্ভার প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপ কমাতে ব্যবহৃত হয় “ইভাপোরেটিভ কুলিং”, যেখানে জল বাষ্পীভূত হয়ে তাপ সরিয়ে নেয়।
ফলাফলঃ
-
ব্যবহৃত জল পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়;
-
এটি সরাসরি বায়ুমণ্ডলে হারিয়ে যায়।
জল ব্যবহারের পরিমাণ
একটি বড় ডেটা সেন্টার প্রতিদিনঃ
-
লাখ লাখ লিটার জল ব্যবহার করতে পারে;
ভারতের মোট ডেটা সেন্টার খাত বছরেয়ঃ
-
১০০–১৫০ বিলিয়ন লিটার জল ব্যবহার করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় অনুমান করা হয়।
জলকষ্টের শহরেই ডেটা সেন্টার!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ডেটা সেন্টারের অবস্থানঃ
-
বেঙ্গালুরু
-
হায়দ্রাবাদ
-
চেন্নাই
এই শহরগুলো ইতিমধ্যেই তীব্র জলসংকটে ভুগছে।
অর্থাৎ, যেখানে মানুষের পানীয় জল সংকট, সেখানেই প্রযুক্তি শিল্প বিপুল জল ব্যবহার করছে।
ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা
নীতি আয়োগ-এর রিপোর্ট অনুযায়ীঃ
-
ভারতের বহু শহর “Day Zero”–এর মুখে;
-
অর্থাৎ, যেখানে নলকূপে আর জল থাকবে না
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান উন্নয়ন মডেলকে প্রশ্ন করা জরুরি।
সমাধানঃ আছে, কিন্তু কঠিন
সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়, তবে চ্যালেঞ্জিংঃ
১. কৃষিতে পরিবর্তন
-
কম জল লাগে এমন ফসল (যেমন ভুট্টা, বাজরা);
-
ড্রিপ ইরিগেশন।
২. শিল্পে কঠোর নীতি
-
Water Audit বাধ্যতামূলক করা;
-
বর্জ্য শোধন নিশ্চিত করা।
৩. প্রযুক্তিতে উন্নয়ন
-
Closed-loop cooling
-
Liquid immersion cooling
এই প্রযুক্তিগুলো জল অপচয় ৭০–৯০% পর্যন্ত কমাতে পারে, কিন্তু খরচ বেশি।
শেষ প্রশ্নঃ আমরা কোন উন্নয়ন চাই?
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত নয়— নৈতিক।
আমরা কি এমন এক ভবিষ্যৎ চাই—
-
যেখানে গাড়িতে সবুজ জ্বালানি থাকবে;
-
মোবাইলে উন্নত এআই থাকবে;
-
কিন্তু পান করার জল থাকবে না?
উন্নয়ন যদি জীবনের ভিত্তিকেই ধ্বংস করে, তবে তা উন্নয়ন নয়, অদূরদর্শিতা।

ভারতের সামনে আজ একটি কঠিন কিন্তু অপরিহার্য সিদ্ধান্ত—
জ্বালানি, প্রযুক্তি, নাকি জল— কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে?
আসলে উত্তরটি “একটি বেছে নেওয়া” নয়, বরং সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
কারণ জল শুধু একটি সম্পদ নয়, এটি জীবনের মৌলিক শর্ত।
এখনই যদি আমরা নীতিগত ও প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তন না আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাবো এক উন্নত কিন্তু তৃষ্ণার্ত পৃথিবী।
