Headlines

হাতে হাতে বিকাশ, হিসাবটা আসলে কার পক্ষে?

বিকাশ ঋণ

লেনদেন, সঞ্চয় ও ঋণ— বিকাশের সহজ সেবার আড়ালে গ্রাহকের প্রকৃত খরচ ও আর্থিক চাপের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন।


বিকাশ বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনকে সহজ করেছে। টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, সঞ্চয় থেকে শুরু করে এখন ব্যাংকঋণ— সবই করা যাচ্ছে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা মানুষের জন্য এই ডিজিটাল ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই সহজ ব্যবস্থার আর্থিক হিসাবটা শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে?

গ্রাহকের জন্য, নাকি সেবা প্রদানকারীর জন্য?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ বিকাশ এখন শুধু টাকা লেনদেনের মাধ্যম নয়। একই প্ল্যাটফর্মে রয়েছে লেনদেন, সঞ্চয় এবং ঋণের মতো একাধিক আর্থিক সেবা। ফলে একজন স্বল্পআয়ের মানুষের আর্থিক জীবনের বড় একটি অংশ ক্রমেই একটি অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

টাকা পাঠানোর সহজতায় খরচ কত?

বিকাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেবাগুলোর একটি Send Money। পরিবারকে টাকা পাঠানো, বন্ধুকে টাকা দেওয়া কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অর্থ স্থানান্তর— সবকিছুই কয়েক সেকেন্ডে করা সম্ভব।

কিন্তু প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃত খরচ কত?

কোন লেনদেনে কত চার্জ, কোন সীমা পর্যন্ত সুবিধা, কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ— এই হিসাব সাধারণ গ্রাহক কতটা সহজে বুঝতে পারছেন, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একজন মানুষের কাছে ১০ বা ২০ টাকা হয়তো সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু মাসের পর মাস নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ছোট ছোট খরচই তার মোট আয়ের একটি অংশ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সঞ্চয়ের নামেও কি রয়েছে হিসাবের প্রশ্ন?

বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় বা DPS করার সুযোগ রয়েছে। ফলে যে মানুষ আগে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে সঞ্চয় করতে পারতেন না, তিনিও এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।

এটি অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু একই সঙ্গে জানতে হবে— গ্রাহক কত টাকা জমাচ্ছেন, কত মুনাফা পাচ্ছেন, মেয়াদ শেষে কত টাকা ফেরত পাচ্ছেন এবং এই পুরো ব্যবস্থায় কোনো ফি বা অন্য কোনো খরচ আছে কি না।

অর্থাৎ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একইঃ

গ্রাহক যে টাকা রাখছেন, তার প্রকৃত আর্থিক সুবিধা কত?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ঋণ নিয়ে

বিকাশের সঙ্গে সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ন্যানো লোন এখন লাখ লাখ মানুষের কাছে সহজলভ্য। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের শাখায় যেতে হচ্ছে না। কাগজপত্রের ঝামেলা নেই। জামানতের প্রয়োজন নেই।

কয়েকটি ক্লিকেই টাকা পাওয়া যাচ্ছে।

এই সহজলভ্যতা জরুরি সময়ে মানুষের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে।

কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন—

যে মানুষটির ৫০০ টাকা প্রয়োজন, সে যদি বারবার ৫০০ টাকা ঋণের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তাহলে সেটি কি আর্থিক সহায়তা, নাকি ঋণনির্ভরতার শুরু? ঋণ নিচ্ছে, আবার ঋণ ডিউ হচ্ছে। টাকা ঢোকার সাথে সাথে ঋণের টাকা কেটে নিচ্ছে। হিসেবটি দাঁড়ায়— নিজের টাকাই সে আসলে ঋণে খরচ করছে।

মাইক্রোক্রেডিটের পুরনো চক্র, ডিজিটাল রূপে?

বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিট বহু মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছে। তবে এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন রয়েছে— একজন দরিদ্র মানুষ যখন আগের ঋণের কিস্তি দিতে নতুন ঋণ নেন, তখন তিনি কি সত্যিই ঋণ থেকে বের হচ্ছেন?

নাকি এক ঋণ দিয়ে আরেক ঋণ পরিশোধ করতে করতে একটি চক্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন?

ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গ

বিকাশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার গ্রাহকভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং সুদ দৈনিক হিসাবে জমা হয়। ঋণের সঙ্গে প্রসেসিং ফিও রয়েছে।

ফলে শুধু ঘোষিত সুদের হার দিয়ে একজন গ্রাহকের প্রকৃত খরচ বোঝা সম্ভব নয়।

ধরা যাক, একজন মানুষ ৫০০ টাকা ঋণ নিলেন।

তিনি কত টাকা হাতে পেলেন?

কত টাকা সুদ হলো?

কত টাকা প্রসেসিং ফি?

কত দিনে ঋণ পরিশোধ করলেন?

আংশিক টাকা দিলে হিসাব কীভাবে হলো?

পুনরায় ঋণ নিলে আগের ঋণের সঙ্গে নতুন ঋণের সম্পর্ক কী?

সব মিলিয়ে এক বছরে তার প্রকৃত ঋণব্যয় কত?

এই হিসাবই সাধারণ গ্রাহকের সামনে সবচেয়ে সহজ ভাষায় থাকা উচিৎ।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ঋণ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার না হয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

একজন শ্রমিক আজ ৫০০ টাকা ঋণ নিলেন। সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনলেন। পরের সপ্তাহে তার আয় থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ করলেন।

তারপর আবার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিল।

আবার ঋণ নিলেন।

এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে ঋণ তার আয় বাড়াচ্ছে না। বরং ভবিষ্যতে যে টাকা তিনি উপার্জন করবেন, তার একটি অংশ আগেই খরচ হয়ে যাচ্ছে।

অর্থাৎ মানুষ নিজের শ্রমের বিনিময়ে যে টাকা আয় করছেন, সেই আয়ের ওপরই বারবার ঋণের খরচ বহন করছেন।

মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে যে ‘ঋণচক্রের’ আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে, ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি নতুনভাবে দেখা দিচ্ছে।

সহজ ঋণ কি অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে?

প্রচলিত ব্যাংকঋণের একটি বাধা হলো প্রক্রিয়া। আবেদন, কাগজপত্র, যাচাই, অনুমোদন— সব মিলিয়ে সময় লাগে।

ডিজিটাল ঋণে সেই বাধাগুলো অনেকটাই কম।

এটি সুবিধা।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিই ঝুঁকি।

কারণ ঋণ নেওয়ার আগে মানুষকে যদি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, তাহলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা বারবার ঋণ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

তাই ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রে শুধু ‘কতজন ঋণ পেলেন’— এটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

কতজন ঋণ নিয়ে আর্থিকভাবে উপকৃত হলেন এবং কতজন বারবার ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন?

বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের কাছে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণঃ

  • একজন গ্রাহক একটি ঋণ পুরোপুরি পরিশোধের আগে নতুন ঋণ নিতে পারেন কি?
  • কত শতাংশ গ্রাহক একাধিকবার ঋণ নেন?
  • একজন গ্রাহক গড়ে কতবার ঋণ নেন?
  • আংশিক কিস্তি দিলে টাকা প্রথমে সুদ, ফি নাকি মূলধনের সঙ্গে সমন্বয় হয়?
  • গ্রাহকের অ্যাপে মোট বকেয়া, সুদ, ফি ও মূলধনের হিসাব কি আলাদাভাবে দেখানো হয়?
  • একজন গ্রাহকের প্রকৃত ঋণব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হয়?
  • অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা রয়েছে?
  • কোনো গ্রাহক নিয়মিত নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করছেন কি না, সেটি কি শনাক্ত করা হয়?

প্রশ্ন বিকাশকে ঘিরে, প্রশ্ন ডিজিটাল অর্থনীতিকে নিয়েও

বিকাশকে শুধু একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কারণ এটি এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের অংশ।

তাই প্রশ্নটিও বড় হওয়া দরকার।

হাতে হাতে বিকাশ, কিন্তু হিসাবটা আসলে কার পক্ষে?

যদি সহজ লেনদেন মানুষের সময় ও খরচ বাঁচায়— তা জনবান্ধব।

যদি সহজ সঞ্চয় মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করে— তা জনবান্ধব।

যদি সহজ ঋণ মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে— তাও জনবান্ধব।

কিন্তু যদি সহজ ঋণ মানুষকে বারবার ঋণ নিতে বাধ্য করে, যদি গ্রাহক নিজের দায়ের হিসাব বুঝতে না পারেন, যদি ছোট ছোট চার্জ ও সুদ মিলিয়ে তার আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে— তাহলে সেই সহজতার সামাজিক মূল্যও হিসাব করতে হবে।

কারণ ডিজিটাল আর্থিক সেবার সাফল্য শুধু কত কোটি লেনদেন হলো, কত লাখ মানুষ ঋণ পেলেন কিংবা কতজন অ্যাপ ব্যবহার করছেন— এতে শেষ হয় না।

সাফল্যের আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত— এই ব্যবস্থায় সাধারণ গ্রাহক শেষ পর্যন্ত কতটা লাভবান হলেন।

হাতে হাতে বিকাশ।
কিন্তু হিসাবটা আসলে কার পক্ষে?


সম্পর্কিত সংবাদ

ক্যাশ-আউট ফিতে বাংলাদেশ কোথায়, অন্য দেশে কত?


💡

বিকাশ হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা (MFS) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। 
  • প্রতিষ্ঠা ও মালিকানা: ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এর মালিকানায় ব্র্যাক ব্যাংক (৫১% শেয়ার) ছাড়াও আমেরিকার ‘মানি ইন মোশন’, বিশ্বব্যাংকের ‘আইএফসি’, ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’, এবং জাপানের ‘সফটব্যাংক’-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে।
  • গ্রাহক সংখ্যা: বর্তমানে সারা দেশে বিকাশের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ৮ কোটি ২০ লাখেরও বেশি। দেশজুড়ে তাদের ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি এজেন্ট পয়েন্ট রয়েছে।
  • মূল সেবা: টাকা পাঠানো (Send Money), ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট, মোবাইল রিচার্জ, বিভিন্ন কেনাকাটার পেমেন্ট, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বিদেশ থেকে রেমিটেন্স আনা এবং অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ন্যানো লোন ও সেভিংস (FDR) স্কিম চালু করা।
  • ব্যবসায়িক অবস্থান: এটি দেশের প্রথম বিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ বা ‘ইউনিকর্ন’ কোম্পানি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিকাশের বার্ষিক রেভিনিউ বা আয় ৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।