ফলোআপ ডেস্ক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে— ধর্ম, বিপ্লব এবং সুবিধাবাদী মানুষের অবাধ বিচরণ কীভাবে একই রাজনৈতিক পরিসরে এসে মিলেমিশে গেল?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল বৈষম্য ও কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন হিসেবে। পরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ আন্দোলনকে বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। কিন্তু একটি স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানকে সরাসরি ধর্মীয় বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন বাস্তবতাকে সরলীকরণ, তেমনি আন্দোলনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ভূমিকা অস্বীকার করাও ভুল।
সমস্যা তৈরি হয় বিপ্লবের পরের শূন্যতায়।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, দলীয়করণ এবং পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর পতনের পর যখন নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়, তখন মাঠে আগে থেকেই সংগঠিত ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো দ্রুত জায়গা করে নিতে পারে। সেখানে ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিও যেমন থাকে, তেমনি থাকে পুরোনো সুবিধাবাদী, ক্ষমতালোভী এবং সুযোগসন্ধানী চরিত্রগুলো।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার— ধর্ম নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হলো ধর্মকে রাজনৈতিক বৈধতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।
যখন কেউ বলতে শুরু করে, “আমি ধর্মের পক্ষে, তাই আমার বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা”— তখন সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
একই ঘটনা বিপ্লবের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।
“আমি বিপ্লব করেছি”— এই পরিচয় যদি কাউকে এমন ধারণা দেয় যে সে আইন, প্রতিষ্ঠান কিংবা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে, তখন বিপ্লব আর মুক্তির শক্তি থাকে না; সেটি নতুন ক্ষমতার লাইসেন্সে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন দুটি পরিচয় একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়—
“আমি ধর্মের প্রতিনিধি” এবং “আমি বিপ্লবের প্রতিনিধি।”
তখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেকে জনগণের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়। তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা তখন সহজেই “ধর্মবিরোধিতা”, “বিপ্লববিরোধিতা” কিংবা “দেশবিরোধিতা” হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
আর এই জায়গাটিই সুবিধাবাদীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
যে ব্যক্তি গতকাল দুর্নীতিতে জড়িত ছিল, সে আজ বিপ্লবের স্লোগান দিতে পারে।
যে ব্যক্তি গতকাল অন্যায় করেছে, সে আজ ধর্মীয় পরিচয় সামনে আনতে পারে।
যে রাজনৈতিক চরিত্র জনগণের অধিকার নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি, সেও আজ নিজেকে বিপ্লবের সৈনিক হিসেবে হাজির করতে পারে।
বিপ্লব মানুষের অতীত মুছে দেয় না। কিন্তু রাজনৈতিক বয়ান অনেক সময় অতীতকে আড়াল করে দিতে পারে।
এ কারণেই একটি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিপ্লবের দিন নয়— বিপ্লবের পরের দিন।
কারা ক্ষমতায় গেল?
কারা আইন ভাঙলেও পার পেয়ে গেল?
কারা মব তৈরি করতে পারল?
কারা ধর্মের আবেগকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল?
কারা বিপ্লবের পরিচয় ব্যবহার করে জবাবদিহি এড়িয়ে গেল?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আইনের শাসন কি সবার জন্য সমান রইল?
ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের উৎস হতে পারে। বিপ্লব অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের শক্তি হতে পারে। কিন্তু ধর্মকে যদি রাজনৈতিক ঢাল এবং বিপ্লবকে যদি ব্যক্তিগত ক্ষমতার লাইসেন্স বানানো হয়, তাহলে দুটিই মানুষের মুক্তির বদলে নতুন নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
তাই বাংলাদেশের সংকটকে শুধু ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
মূল সংকট হলো— আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারছি, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, বিপ্লবী পরিচয়, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জনপ্রিয়তার কোনো পরিচয়ই একজন মানুষকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারবে না?
কারণ রাষ্ট্রে যদি আইন দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠান যদি নতজানু হয় এবং সমাজ যদি নৈতিকতার একচেটিয়া মালিকানা কাউকে দিয়ে দেয়, তাহলে দুষ্ট লোকের জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ হয়ে যায় ভালো মানুষের পোশাক পরা।
তখন দেখা যায় এক অদ্ভুত বাস্তবতা—
দুষ্ট লোকটি ধর্মের ভাষায় কথা বলছে, বিপ্লবের পোশাক পরছে, আর আইন তার পেছনে দৌড়াচ্ছে।
এটাই হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন।
