পর্ব–১: সত্যের সন্ধানে যারা জীবন হারিয়েছেন
FollowUpNews | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, অনেকের কাছে এটি সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সাংবাদিককে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। কেউ দুর্নীতি, সন্ত্রাস কিংবা মাদক চক্র নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন, কেউ রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ নিজ বাড়ির ভেতরেই নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা Committee to Protect Journalists (CPJ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড আজও বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে আছে, আবার কিছু মামলায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর রায় হয়েছে।
আজকের পর্বে থাকছে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত পাঁচটি সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড।

১. সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা (২০১২)
যে হত্যাকাণ্ড আজও দেশের সবচেয়ে বড় সাংবাদিক হত্যা রহস্য
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয় দেশের দুই পরিচিত টেলিভিশন সাংবাদিক—মাছরাঙা টেলিভিশনের নিউজ এডিটর সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির রক্তাক্ত মরদেহ। দুজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। আরও মর্মান্তিক বিষয় ছিল, হত্যাকাণ্ডের সময় একই বাসায় উপস্থিত ছিল তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মাহির সারওয়ার মেঘ।
ঘটনাটি প্রকাশের পর পুরো দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়। সাংবাদিক সমাজ রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর—সর্বত্র মানববন্ধন, কর্মবিরতি, কালোব্যাজ ধারণ, অনশন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিকদের একটাই দাবি ছিল—হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা।
প্রথমে পুলিশ, পরে র্যাবের হাতে তদন্তের দায়িত্ব যায়। কিন্তু তদন্ত বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বারবার বাড়ানো হয়। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত অমীমাংসিত সাংবাদিক হত্যা মামলায় পরিণত হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোও নিয়মিত এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রশ্নটি আজও একই রয়ে গেছে—কে হত্যা করেছিল সাগর ও রুনিকে, আর কেন?
২. মানিক চন্দ্র সাহা হত্যা (২০০৪)
চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লেখালেখি, তারপর বোমা হামলায় মৃত্যু
খুলনার সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহা ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম সাহসী সংবাদকর্মী। তিনি নিউ এজ-এর প্রতিনিধি, বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা এবং এর আগে সংবাদ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। চরমপন্থী সংগঠন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অপরাধচক্র নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন করার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি পাচ্ছিলেন।
২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠান শেষে রিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। ঠিক তখনই দুর্বৃত্তরা তার রিকশার কাছে বোমা নিক্ষেপ করে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হন।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী উভয়েই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান। আন্তর্জাতিক সংস্থা UNESCO, CPJ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও এ হত্যার তীব্র প্রতিবাদ করে।
দীর্ঘ ১২ বছর পর, ২০১৬ সালে আদালত নয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ ছিল, হামলার অর্থদাতা ও প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের সবাই বিচারের আওতায় আসেননি।
মানিক সাহার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যা (২০২৩)
স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন, তারপর নির্মম হামলা
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম ছিলেন Banglanews24.com-এর উপজেলা প্রতিনিধি। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করতেন।
২০২৩ সালের ১৪ জুন রাতে একটি অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে তার ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে জামালপুর, পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
সহকর্মীদের দাবি ছিল, স্থানীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণেই তিনি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ঘটনাটি সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো দ্রুত বিচার এবং সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায়।
পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে এবং মামলার তদন্ত শুরু করে। নাদিমের মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তোলে—মফস্বল সাংবাদিকরা কতটা নিরাপদ?
৪. বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির হত্যা (২০২১)
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছিল। সেই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে যান অনলাইন সংবাদমাধ্যম বার্তাবাজার-এর সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির।
সংঘর্ষ চলাকালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কয়েকদিন পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যু শুধু সাংবাদিক মহলেই নয়, পুরো দেশেই আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার পর সাংবাদিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন সংগঠন স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানায়।
মুজাক্কিরের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে।
৫. মোহিউদ্দিন সরকার নয়ীম হত্যা (২০২২)
মাদক চক্রের অনুসন্ধানে গিয়ে আর ফিরে আসেননি
কুমিল্লার সাংবাদিক মোহিউদ্দিন সরকার নয়ীম স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য। তিনি সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
২০২২ সালের এপ্রিলে তাকে মাদক চোরাকারবারিরা তথ্য দেওয়ার কথা বলে সীমান্ত এলাকায় ডেকে নেয়। পরে সেখানে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তকারী সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হামলা।
এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক সংগঠন Reporters Without Borders (RSF) জানায়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হবে। স্থানীয় পুলিশ একাধিক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তদন্ত শুরু করে।
নয়ীমের মৃত্যু প্রমাণ করে, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক কতটা বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারেন।
৬. শামসুর রহমান হত্যা (২০০০)
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কলম, শেষ পর্যন্ত গুলিতেই থেমে গেল জীবন
যশোরের সাহসী সাংবাদিক শামসুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সন্ত্রাসী চক্র, সীমান্ত অপরাধ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠ-এর যশোর প্রতিনিধি ছিলেন। সাহসী সাংবাদিক হিসেবে তার পরিচিতি ছিল দেশজুড়ে।
২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে যশোর শহরের নিজ বাড়ির সামনে পৌঁছানোর পর দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি।
হত্যাকাণ্ডের পর পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলোও এ ঘটনায় উদ্বেগ জানায়।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার পরও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা দেয়। সহকর্মীদের মতে, শামসুর রহমানের মৃত্যু ছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর একটি বড় আঘাত। তার হত্যাকাণ্ড আজও বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে আছে—সত্য প্রকাশের মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও দিতে হয়।
৭. গৌতম দাস হত্যা (২০০৫)
অপরাধ জগতের খবর লিখতে গিয়ে প্রাণ হারান তরুণ সাংবাদিক
যশোর অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন সাংবাদিক গৌতম দাস। তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করলেও তার অনেক প্রতিবেদন জাতীয় পর্যায়েও আলোচিত হয়েছিল।
২০০৫ সালে এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তার ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।
তদন্তে উঠে আসে, স্থানীয় অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণেই তিনি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন বলে সন্দেহ করা হয়। ঘটনার পর যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
গৌতম দাসের মৃত্যু স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই তখন প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন যে, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
৮. নাহার আলী হত্যা (২০০১)
স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন, তারপর অপহরণ ও নির্মম নির্যাতন
খুলনার সাংবাদিক নাহার আলী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় অপরাধ, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতেন।
২০০১ সালে হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
তদন্তে বিভিন্ন অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। সহকর্মীদের মতে, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণেই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
নাহার আলীর মৃত্যু বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই একা কাজ করেন, অথচ তাঁদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না—এই বাস্তবতা তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৯. আবু তাহের মো. তুরাব (২০২৪)
সংঘাতের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এক সংবাদকর্মী
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলি এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আহত ও নিহত হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক।
তাদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক নয়াদিগন্ত-এর সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব। দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রাণ হারান। তার মৃত্যু সাংবাদিক মহলে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
ঘটনার পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনগুলো সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।
তুরাবের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দেয়—সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা প্রায়ই নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখেই মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
১০. ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত অন্যান্য সংবাদকর্মীরা
ক্যামেরার পেছনে থেকেও রক্ষা পাননি
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের সময় শুধু একজন নন, একাধিক সংবাদকর্মী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত বা গুরুতর আহত হন। কেউ সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন, কেউ সহিংসতার মধ্যে পড়ে প্রাণ হারান। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানায়, এই সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের বহু ঘটনা ঘটে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেস লেখা জ্যাকেট ও পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা ঝুঁকির বাইরে থাকতে পারেননি। এই ঘটনাগুলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কারণ সংবাদকর্মীরা নিরাপদ না থাকলে সত্য তথ্যও মানুষের কাছে নিরাপদে পৌঁছাতে পারে না।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস শুধু সাফল্যের নয়, আত্মত্যাগেরও ইতিহাস। বহু সাংবাদিক সত্য প্রকাশের জন্য জীবন দিয়েছেন, অনেকেই হামলার শিকার হয়েছেন, আবার অনেক হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আজও যখন কোনো সাংবাদিক দুর্নীতি, অপরাধ বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, তখন অতীতের এসব হত্যাকাণ্ড স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যের পথ কখনও সহজ ছিল না। আর সেই কারণেই নিহত সাংবাদিকদের স্মরণ করা মানে শুধু তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়, একই সঙ্গে এমন একটি সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করা, যেখানে কোনো সংবাদকর্মীকে সত্য প্রকাশের কারণে প্রাণ হারাতে হবে না।
