Headlines

১০–৫০ হাজারে শহরে, বিচে আরও বেশিঃ কক্সবাজারের রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ঘুষের অভিযোগ

রেস্তোরাঁ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মালিকদের দাবি— বড় প্রতিষ্ঠানে মাসিক অঙ্ক আরও বেশি; আগের অনুসন্ধানেও উঠেছিল কর্মকর্তাদেের ‘ম্যানেজ’ করে কম ভ্যাট দেওয়ার অভিযোগ


কক্সবাজার প্রতিনিধি

কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ভ্যাট আদায় ও তদারকিকে ঘিরে আবারও বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলোআপ নিউজের ধারাবাহিক অনুসন্ধানে কথা বলা একাধিক রেস্তোরাঁ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভ্যাট বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের কথা জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঝারি আকারের রেস্তোরাঁ থেকে মাসে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বড় রেস্তোরাঁয় কথিত মাসিক অঙ্ক আরও বেশি।

তবে অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো— কক্সবাজার শহরের তুলনায় বিচ এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে কথিত অর্থ লেনদেনের হার ও পরিমাণ বেশি বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। এটি লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

রেস্তোরাঁ
খাবারের প্লেটে অনিয়ম: রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ফাঁকি ও ঘুষের ওপেন সিক্রেট!।

পুরোনো অভিযোগ, নতুন করে একই প্রশ্ন

কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ফাঁকি ও ভ্যাট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়।

২০২৩ সালে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজারের ভ্যাট কমিশনারকে হাইকোর্টে তলব করার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী প্রতিবেদনে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনের বরাতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়।

একই বছর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথিত ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে প্রকৃত ভ্যাটের তুলনায় কম ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

২০২৪ সালেও কক্সবাজারের রেস্তোরাঁ খাতে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু সাম্প্রতিক কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়; গত কয়েক বছর ধরেই কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের ভ্যাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ও রাজস্ব-ফাঁকির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।

এবার রেস্তোরাঁ মালিকদের মুখে ‘মাসিক’ হিসাব

ফলোআপ নিউজের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে কথা বলা রেস্তোরাঁ মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যাট-সংক্রান্ত তদারকি ও ঝামেলা এড়াতে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত অর্থ দিতে হয়।

তাদের দাবি, মাঝারি রেস্তোরাঁয় মাসিক কথিত অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এই হিসাবে একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে—

  • মাসে ১০ হাজার টাকা হলে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা;
  • মাসে ৫০ হাজার টাকা হলে বছরে ৬ লাখ টাকা

আর বড় রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বেশি বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

তবে এসব অঙ্ক এখনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নথি দিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে এগুলোকে ব্যবসায়ীদের দেওয়া অভিযোগভিত্তিক তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

শহরের চেয়ে বিচ এলাকায় অঙ্ক বেশি কেন?

ফলোআপ নিউজের আগের অনুসন্ধানের তথ্যের সঙ্গে এবারকার সাক্ষাৎকারগুলো মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন পাওয়া যাচ্ছে— শহরের তুলনায় বিচ এলাকার পর্যটননির্ভর রেস্তোরাঁগুলোতে কথিত অর্থের অঙ্ক বেশি।

ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা, পর্যটন মৌসুমে বিচ এলাকার রেস্তোরাঁয় লেনদেন ও বিক্রির পরিমাণ বাড়ে। ফলে ভ্যাটের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি হওয়ার কথা। এই বড় ব্যবসায়িক পরিসরই কথিত অনানুষ্ঠানিক অর্থের অঙ্ক বাড়ানোর একটি কারণ হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

তবে এই ব্যাখ্যাও এখনো যাচাইযোগ্য অনুমান— এটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না।

ভ্যাট ফাঁকি ও ঘুষ— দু’টি কি একই চক্রের অংশ?

এখানেই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একটি রেস্তোরাঁ প্রকৃত বিক্রয় গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিলে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায়। আর সেই অনিয়ম দেখেও কোনো কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে ব্যবস্থা না নিলে অভিযোগটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ভ্যাট এবং ঘুষের ফাঁদে খাবারের মান নেমে যায়, দাম বাড়ে। ভোক্তারা বঞ্চিত হয়।

ফলে অনুসন্ধানের বিষয়টি শুধু ‘কে কত ঘুষ নেয়’— এখানে সীমাবদ্ধ না রেখে দেখতে হবে—

প্রকৃত বিক্রি → প্রদর্শিত বিক্রি → প্রযোজ্য ভ্যাট → পরিশোধিত ভ্যাট → পরিদর্শন → নোটিশ/অ্যাসেসমেন্ট → কথিত অর্থ লেনদেন।

এই পুরো চেইনে কোথায় অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে।

আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন তথ্যের মিল কোথায়?

ফলোআপ নিউজের পূর্ববর্তী অনুসন্ধানে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর ভ্যাট হিসাব, ব্যবসার পরিমাণ ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছিল।

নতুন সাক্ষাৎকারগুলো সেই অনুসন্ধানে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি যদি নথির মাধ্যমে সত্যতা পায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে— ভ্যাটের হিসাবের অসঙ্গতি কি শুধু ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকির ফল, নাকি তদারকি ব্যবস্থার ভেতরেও কোনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক কাজ করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে শুধু রেস্তোরাঁ মালিকের বক্তব্য যথেষ্ট নয়। কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের নথিও একই সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।

কোন নথিতে মিলবে সত্য?

ফলোআপ নিউজের পরবর্তী অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁগুলোর—

১. BIN ও ভ্যাট রিটার্ন
২. মাসিক বিক্রয় বিবরণী
৩. মূসক চালান
৪. ভ্যাট পরিশোধের তথ্য
৫. ভ্যাট পরিদর্শন প্রতিবেদন
৬. জারি করা নোটিশ
৭. অডিট ও অ্যাসেসমেন্ট নথি
৮. জরিমানা বা দাবিকৃত ভ্যাটের তথ্য
৯. পূর্ববর্তী তদন্ত বা মামলা সংক্রান্ত নথি
১০. কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাসঙ্গিক যোগাযোগের রেকর্ড

পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে শহর বনাম বিচ এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর একই ধরনের তথ্য পাশাপাশি বসিয়ে তুলনা করলেই বোঝা যেতে পারে অভিযোগের পেছনে বাস্তব কোনো প্যাটার্ন আছে কিনা। এনবিআর এবং দুদকে আবেদন করে প্রতিকার চাওয়ার কথাও ভাবছে নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও জরুরি

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই অনুসন্ধানের অপরিহার্য অংশ। কোনো কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করেছেন— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অভিযোগকারী, অভিযুক্ত পক্ষ এবং নথি— তিন দিক থেকেই তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন ভ্যাট প্রশাসনের দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ও তদারকি করা।

কাজেই অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্নটি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নয়; রাজস্ব প্রশাসনের তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।

অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন

কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ কেন ফিরে আসছে?

কেন শহর ও বিচ এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে কথিত অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদানের অঙ্কে পার্থক্যের অভিযোগ উঠছে?

প্রকৃত বিক্রয় ও ভ্যাট রিটার্নের মধ্যে কোথায় সবচেয়ে বড় ব্যবধান?

কোন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আসে এবং কোনগুলো আসে না?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— ভ্যাট তদারকি কি সত্যিই রাজস্ব আদায়ের জন্য, নাকি কোথাও কোথাও সেটি ‘মাসিক’ আদায়ের সুযোগে পরিণত হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে ফলোআপ নিউজের নথি-ভিত্তিক অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।

ফলোআপ নিউজ | কক্সবাজার


সম্পর্কিত সংবাদ

১.

সুশান্ত পালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে দুদক

২.

ছয় সহযোগীসহ দুদকের কাঠগড়ায় সুশান্ত পাল

৩.

ভ্যাটের হাজার কোটি টাকা লোপাট, তদন্তের অগ্রগতি জানতে চান হাইকোর্ট