Headlines

মেঘমল্লারের আত্মহত্যার চেষ্টাঃ বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সংকট ও বিপ্লবী রাজনীতির আত্মবিচ্ছিন্নতা

ছাত্র ইউনিয়ন

যে রাজনীতি মানুষের মুক্তির কথা বলে, সেই রাজনীতি যখন নিজের কর্মীকেই ভবিষ্যৎ দেখাতে ব্যর্থ হয়।

ছাত্র ইউনিয়ন
মেঘমল্লার বসু লাইফ সাপোর্টে আছে বলে জানা যাচ্ছে। মেঘমল্লার বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাবেক সভাপতি।

মেঘমল্লার বসুকে নিয়ে এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বললে ভুল হবে।

কারণ ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মেঘমল্লার বসুকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে তিনি সামাজিক মাধ্যমে বিদায়ী ধরনের একটি পোস্ট করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার ব্যক্তিগত হতাশা, অপরাধবোধ, পারিবারিক বিষয় এবং রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। এর কয়েক মাস আগেও, ফেব্রুয়ারিতে, তার আত্মহত্যার চেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

মেঘমল্লার বর্তমানে কী অবস্থায় আছেন, তার ব্যক্তিগত সংকটের প্রকৃত কারণ কী— এসবের উত্তর তার নিজের বক্তব্য, পরিবার ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই খুঁজতে হবে।

কিন্তু একজন বামপন্থী ছাত্রনেতার বারবার আত্মবিনাশের কিনারায় চলে যাওয়া আমাদের একটি বৃহত্তর প্রশ্ন করার অধিকার দেয়।

একজন বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী যখন নিজের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক কোনোভাবেই দেখতে পান না, তখন দায়টি কি কেবল ব্যক্তির? নাকি তার রাজনৈতিক পরিবেশকেও প্রশ্ন করতে হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশের বাম রাজনীতির দিকে তাকাতে হবে।

১. বাংলাদেশের বাম রাজনীতি কি আদৌ ‘বাম’ আছে?

বাংলাদেশে বাম রাজনীতি আছে— দল আছে, পতাকা আছে, মিছিল আছে, স্লোগান আছে, ছাত্র সংগঠন আছে, শ্রমিক সংগঠন আছে, বিপ্লবের ভাষা আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

এর মধ্যে কতটা জীবন্ত রাজনৈতিক শক্তি?

আর কতটা শুধু রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অবশিষ্টাংশ?

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অস্তিত্ব আর কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ঐতিহাসিক কার্যকারিতা এক বিষয় নয়।

মার্কসবাদী ভাষায় বললে, শুধু ‘class position’ সম্পর্কে কথা বললেই শ্রেণির রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি হয় না।

শ্রমিকের নামে কথা বললেই শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হয় না।

বিপ্লবের কথা বললেই বিপ্লবী রাজনীতি তৈরি হয় না।

তার জন্য দরকার—

সংগঠন, গণভিত্তি, রাজনৈতিক কৌশল, শ্রেণিসংঘাতের বাস্তব পাঠ এবং ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের সক্ষমতা।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সংকট এখানেই।

২. ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক পরিহাস হলো— যে রাজনীতি মূলত প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা ও শ্রেণি আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা, সেই রাজনীতির একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট, সমঝোতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রান্তিক অংশীদারিত্বের মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজেছে।

এটি কোনো অনুমান নয় যে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির একটি অংশ বড় দলের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থেকেছে।

Carnegie Endowment-এর গবেষণায় বাংলাদেশের বাম দলগুলোর বড় দলের ওপর নির্ভরতা, জোট রাজনীতি, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হারানোর বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি ৩৯ জন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফোকাস গ্রুপ এবং কয়েকটি বাম দলের দলিল বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

এখানেই একটি মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসেঃ

বিপ্লবী দল যখন ক্ষমতাবান দলের ওপর রাজনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সে কি ক্ষমতার বিরোধিতা করে, নাকি ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে নিজের জন্য একটি স্থান তৈরি করে?

দুটির মধ্যে পার্থক্য বিশাল।

৩. বিপ্লবের প্রতিষ্ঠানীকরণ

এখানে একটি ধারণা ব্যবহার করা যায়—Institutionalization of Radical Politics

অর্থাৎ যে রাজনীতি একসময় বিদ্যমান রাষ্ট্র ও শ্রেণি কাঠামোকে বদলে দিতে চেয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রাজনীতির নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব, পদ, অফিস, সংগঠন, প্রকাশনা, কমিটি ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তৈরি হয়।

তারপর একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।

ব্যবস্থা বদলানোর জন্য তৈরি প্রতিষ্ঠানটি নিজেই ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।

বিপ্লবী রাজনীতি তখন বিপ্লবের পরিবর্তে সংগঠনের অস্তিত্ব রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।

ক্ষমতা দখলের বদলে ‘রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা’ ধরে রাখাই লক্ষ্য হয়।

আর কর্মীদের বলা হয়—

সংগ্রাম চলছে।

কিন্তু সংগ্রামের গন্তব্য ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।

এটাই রাজনৈতিক self-preservation এবং রাজনৈতিক transformation-এর মধ্যকার পার্থক্য।

ছাত্র ইউনিয়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেঘমল্লার বসু—বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি।

৪. কর্মী তখন কী পায়?

একজন তরুণ যখন বাম রাজনীতিতে প্রবেশ করে, সে সাধারণত কোনো এমপি হওয়ার জন্য প্রবেশ করে না।

সে প্রবেশ করে একটি ধারণার জন্য।

একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য।

একটি অন্যরকম রাষ্ট্রের জন্য।

একটি শোষণমুক্ত ভবিষ্যতের জন্য।

কিন্তু সে যখন কয়েক বছর রাজনীতিতে থাকার পর দেখে—  দল ভাঙছে,

উপদল হচ্ছে,

নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব চলছে,

বড় দলের সঙ্গে জোট হচ্ছে,

নির্বাচনে জামানত থাকছে না,

জনগণের সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক দুর্বল,

তখন তার সামনে একটি ভয়াবহ প্রশ্ন দাঁড়ায়:

আমি যে ভবিষ্যতের জন্য লড়ছি, সেটি কোথায়?

এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক হতাশার কেন্দ্রে চলে আসে।

৫. বাম রাজনীতির ‘গণভিত্তি’ কোথায়?

Carnegie-এর গবেষণা বাংলাদেশের বাম দলগুলোর একটি বড় সংকট হিসেবে গণভিত্তির ক্ষয়কে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে আসে— অনেক তরুণ ভোটার বাম দলগুলোর নাম বা নেতাদেরই ভালোভাবে চেনেন না; দলগুলোর আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও তাদের ধারণা সীমিত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণাটি বাম দলগুলোর শ্রমিক রাজনীতির সাংগঠনিক দুর্বলতাও তুলে ধরে।

অর্থাৎ—

বাম রাজনীতি শ্রমিকের কথা বলে, কিন্তু শ্রমিকের রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে।

এটি শুধু একটি সাংগঠনিক সমস্যা নয়।

এটি একটি class-representation crisis

যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা হচ্ছে, সেই শ্রেণি যদি রাজনৈতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে প্রতিনিধিত্বের দাবিটি কোথায় দাঁড়ায়?

৬. বাম রাজনীতির ‘এলিটিজম’ সমস্যা

Carnegie-এর গবেষণায় বাংলাদেশের বাম দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘elitist’ বা এলিট-ঘেঁষা হওয়ার যে ধারণা সমাজে তৈরি হয়েছে, সেটিও আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও ‘নাস্তিক’ তকমার রাজনৈতিক প্রভাবও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এখানে আরেকটি তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা যায়।

বাম রাজনীতি যদি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে না পারে, তবে তার শ্রেণি-রাজনীতি ধীরে ধীরে ideological subculture-এ পরিণত হয়।

অর্থাৎ সমাজের বড় অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক না রেখে একই ধরনের শিক্ষিত, সচেতন, মতাদর্শী মানুষের একটি সীমিত বৃত্তের মধ্যে রাজনীতি ঘুরতে থাকে।

তখন বিপ্লবী রাজনীতি হয়ে যায়—

মিটিং,

সেমিনার,

বক্তৃতা,

পুস্তিকা,

স্লোগান,

ফেসবুক পোস্ট,

এবং নিজেদের মধ্যকার বিতর্ক।

কিন্তু কৃষক?

শ্রমিক?

রিকশাচালক?

গার্মেন্টস কর্মী?

নিম্ন-মধ্যবিত্ত?

তারা কোথায়?

৭. বিভাজন শুধু দুর্বলতা নয়— এটি রাজনৈতিক পুঁজি নষ্ট করে

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা আছে।

কিন্তু বিভাজনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু দল সংখ্যা বাড়া নয়।

বিভাজন তিনটি জিনিস ধ্বংস করে—

১. ভোটারভিত্তি

২. সাংগঠনিক শক্তি

৩. দর-কষাকষির ক্ষমতা।

Carnegie-এর গবেষণাতেও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বামদের factionalization বা বিভাজন তাদের ভোটভিত্তি খণ্ডিত করেছে, জনবল ও অর্থের সাংগঠনিক শক্তি কমিয়েছে এবং বড় মধ্যপন্থী দলগুলোর তুলনায় দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল করেছে।

এখানে একটি কঠিন প্রশ্নঃ

যে দল নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে পারে না, তারা কীভাবে রাষ্ট্রের কোটি মানুষের ঐক্য তৈরি করবে?

৮. ‘নেতৃত্ব’ ও ‘কর্মী’র দ্বন্দ্ব

এখানেই আপনার মূল প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাম রাজনীতিতে কর্মী সাধারণত sacrifice-bearing subject

সে মিছিল করবে।

সে পুলিশের সামনে দাঁড়াবে।

সে পোস্টার লাগাবে।

সে মামলা খাবে।

সে সংগঠনের জন্য টাকা সংগ্রহ করবে।

সে চাকরি বা ক্যারিয়ারের ক্ষতি করবে।

কিন্তু নেতৃত্ব?

নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি জটিল।

কখনো তারা সংসদে যায়।

কখনো সরকারে যায়।

কখনো বড় দলের সঙ্গে সমঝোতা করে।

কখনো নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি করে।

কখনো রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়ে যায়।

এখানে political representation এবং political interest-এর মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

কর্মী ভাবছে—

আমি রাষ্ট্র বদলাতে চাই।

নেতৃত্ব ভাবতে পারে—

বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে কীভাবে রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করা যায়?

এই দুই রাজনীতি দেখতে একই রকম হলেও আসলে এক নয়।

৯. ‘ডানের কাছ থেকে সুবিধা’— অভিযোগটি কোথায় দাঁড়ায়?

এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এখানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সতর্কতা দরকার।

বাংলাদেশের বাম নেতৃত্বের কেউ ডানপন্থী শক্তির কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন, বিদেশি শক্তির কাছ থেকে অর্থ বা ম্যান্ডেট পেয়েছেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বাম মাঠকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন— এমন অভিযোগ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রমাণ ছাড়া সত্য হিসেবে লেখা যায় না।

কিন্তু এটিকে একটি গবেষণার প্রশ্ন হিসেবে তোলা যায়।

প্রশ্ন হতে পারেঃ

  • কোনো বাম দলের অর্থের উৎস কী?
  • বিদেশি অনুদান আছে কি?
  • কোনো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বা এনজিও নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
  • নেতৃত্বের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন কী?
  • ক্ষমতাসীন বা বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের অপ্রকাশ্য সম্পর্ক কী?
  • নির্বাচনী সময়ে অর্থ ও সাংগঠনিক সহায়তার উৎস কী?
  • কোনো নেতা রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের পর কী সুবিধা পেয়েছেন?
  • রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত সুবিধার মধ্যে কোনো correlation আছে কি?

এই অনুসন্ধান হলে অভিযোগ তত্ত্ব থেকে প্রমাণে পরিণত হতে পারে।

১০. ‘সাম্রাজ্যবাদী ম্যান্ডেট’ তত্ত্বও প্রমাণ চাই

‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটি বাম রাজনৈতিক ভাষায় বহু পুরোনো।

কিন্তু আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ আগের মতো শুধু সরাসরি উপনিবেশ নয়।

এখন তা হতে পারে—

অর্থনৈতিক নির্ভরতা,

আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান,

করপোরেট স্বার্থ,

ভূরাজনৈতিক জোট,

নিরাপত্তা কাঠামো,

NGO-নির্ভর উন্নয়ন মডেল,

বৈদেশিক অনুদান,

কূটনৈতিক প্রভাব,

মিডিয়া ও জ্ঞান উৎপাদনের নেটওয়ার্ক।

কিন্তু কোনো বাম দলকে ‘সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট’ বলতে হলে তার অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান করতে হবে।

নইলে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটিও আরেকটি স্লোগানে পরিণত হবে।

১১. আরও ভয়াবহ সম্ভাবনা: বাম রাজনীতি কি ‘নিরাপদ বিরোধিতা’তে পরিণত হয়েছে?

এখানে একটি তাত্ত্বিক hypothesis দাঁড় করানো যায়।

যদি কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি সীমিত পরিসরের বিরোধিতা সহ্য করে, তাহলে সেই বিরোধিতা কখনো কখনো ব্যবস্থার জন্য নিরাপদও হয়ে উঠতে পারে।

কারণ তখন জনগণের ক্ষোভ একটি সংগঠিত, সীমিত এবং পূর্বানুমানযোগ্য রাজনৈতিক চ্যানেলে প্রবাহিত হয়।

তখন বিপ্লব হয় না।

ব্যবস্থাও ভাঙে না।

কিন্তু মানুষ মনে করে—

বিরোধিতা হচ্ছে।

এটিকে বলা যায় managed dissent বা নিয়ন্ত্রিত বিরোধিতার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি সত্য— এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাবে না।

কিন্তু এটি অবশ্যই অনুসন্ধানের প্রশ্ন হতে পারেঃ

বাম রাজনীতি কি বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে, নাকি ক্ষোভের একটি সীমিত রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে?

এই প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে যখন কোনো সংগঠন বছরের পর বছর আন্দোলন করে, কিন্তু তার গণভিত্তি বাড়ে না এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বিকল্প কাঠামোও তৈরি হয় না।

জনৈতিক কর্মী।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর আত্মহত্যার চেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি একসঙ্গে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন। তখনও তার এমন পদক্ষেপের কারণ স্পষ্ট করা যায়নি। সেপ্টেম্বরে আবার তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ব্যক্তিগত হতাশা, অপরাধবোধ, পারিবারিক বিষয় এবং রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার উল্লেখ ছিল।

এই জায়গায় আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে।

মেঘমল্লারের আত্মহত্যার চেষ্টাকে বাম রাজনীতির ব্যর্থতার সরাসরি ফল বলা যাবে না।

কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয়কে বাদ দিয়ে ঘটনাটিকে বোঝার চেষ্টাও অসম্পূর্ণ হতে পারে।

কারণ মানুষ শুধু ব্যক্তি নয়।

মানুষ একটি সামাজিক সত্তা।

তার রাজনৈতিক পরিচয় তার আত্মপরিচয়ের অংশ হতে পারে।

তার আদর্শ তার জীবনের অর্থের অংশ হতে পারে।

তার সংগঠন তার পরিবারসম সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে।

আর সেই রাজনৈতিক বিশ্বাস ভেঙে গেলে ব্যক্তির অস্তিত্বগত সংকটও তৈরি হতে পারে।

এটি political alienation-এর প্রশ্ন।

মার্কস শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতা বা alienation ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন— মানুষ যখন নিজের শ্রম, উৎপাদন, সৃজনশীলতা এবং মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

রাজনীতিতেও এর একটি সমান্তরাল ধারণা ব্যবহার করা যায়।

একজন কর্মী যদি মনে করেন—

আমি যে রাজনৈতিক কাজ করছি, তার ফল আমার নিয়ন্ত্রণে নেই;

যে নেতৃত্বকে আমি অনুসরণ করছি, তারা আমার অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে না;

যে জনগণের জন্য রাজনীতি করছি, সেই জনগণের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই;

যে ভবিষ্যতের কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তব রাজনৈতিক রূপরেখা নেই;

তাহলে কর্মী ধীরে ধীরে political alienation-এর শিকার হতে পারেন।

সে সংগঠনে আছে।

কিন্তু সংগঠনের সঙ্গে তার জীবন্ত সম্পর্ক নেই।

সে বিপ্লবের কথা বলে।

কিন্তু বিপ্লবের সম্ভাবনা অনুভব করে না।

সে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে।

কিন্তু ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না।

এই জায়গাটিই ভয়ংকর।

১৪. মেঘমল্লারদের সংকট তাই শুধু ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ দিয়ে শেষ করা যাবে না

অবশ্যই ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সর্বাগ্রে।

আত্মহত্যার চেষ্টা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ‘প্রমাণ’ নয়।

কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব আছে।

একজন কর্মীকে শুধু স্লোগান শেখানো যথেষ্ট নয়।

তাকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।

সমালোচনা করার অধিকার দিতে হবে।

নেতৃত্বকে প্রশ্ন করার অধিকার দিতে হবে।

ব্যর্থতার পরেও সংগঠনের মধ্যে জায়গা দিতে হবে।

ব্যক্তিগত সংকটে সহায়তা দিতে হবে।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

তার রাজনৈতিক শ্রমের অর্থ তাকে অনুভব করাতে হবে।

১৫. বাম রাজনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো নির্বাচনে নয়

বামদের নির্বাচনী ব্যর্থতা দৃশ্যমান।

কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যর্থতা হলো—

তারা মানুষের কল্পনাকে দখল করতে পারছে না।

বর্তমান বাংলাদেশে ডান, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি কিংবা নতুন প্রজন্মের আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি— সবাই কোনো না কোনোভাবে ভবিষ্যতের একটি ছবি আঁকার চেষ্টা করছে।

বাম রাজনীতি কি করছে?

অনেক সময় অতীতের ভাষা পুনরাবৃত্তি করছে।

এখানে Antonio Gramsci-এর hegemony ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রক্ষমতা শুধু পুলিশ, সেনাবাহিনী বা প্রশাসনের মাধ্যমে টিকে থাকে না।

মানুষের কল্পনা, সংস্কৃতি, ভাষা ও ‘common sense’-এর ওপরও আধিপত্য তৈরি হয়।

অর্থাৎ যে পক্ষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের কল্পনা দখল করতে পারে, সে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির প্রশ্ন তাই শুধু—

কত ভোট পেল?

তা নয়।

প্রশ্ন হলো—

বাংলাদেশের মানুষ কি এখনো বাম রাজনীতির মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়?

যদি না পায়, তবে সমস্যা আরও গভীর।

১৬. ২০২৬-এর বাংলাদেশ: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বামদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রই বদলে গেছে।

নতুন প্রজন্ম রাজপথে এসেছে।

নতুন দল তৈরি হয়েছে।

পুরোনো দলগুলোর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে; জামায়াত ৬৮টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী শক্তির অন্যতম হয়েছে এবং ছাত্র-উত্থান থেকে তৈরি জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি আসন পেয়েছে।

এই নতুন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে বাম রাজনীতি কোথায়?

এই প্রশ্ন এড়ানো যাবে না।

কারণ একটি বিপ্লবী মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তকে বামরা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারেনি— এমন একটি কঠিন সমালোচনা অবশ্যই করা যায়।

১৭. তাহলে কি বাম রাজনীতি শেষ?

না।

বরং এখানেই সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভুলটি করা হবে।

বাংলাদেশে বৈষম্য আছে।

শ্রমিকের অধিকার প্রশ্ন আছে।

কৃষকের সংকট আছে।

সম্পদের কেন্দ্রীভবন আছে।

বেকারত্ব আছে।

জলবায়ু সংকট আছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বৈষম্য আছে।

নারীর শ্রমের অবমূল্যায়ন আছে।

শহর-গ্রামের বৈষম্য আছে।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন ধরনের শ্রম শোষণ তৈরি হচ্ছে।

অর্থাৎ বাম রাজনীতির objective conditions এখনও বিদ্যমান।

যা সংকটে পড়েছে তা হলো—

subjective capacity।

অর্থাৎ সেই বাস্তব বৈষম্যকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার ক্ষমতা।

এটাই আসল সংকট।

১৮. বাম রাজনীতির সামনে তাই নতুন তত্ত্ব দরকার

পুরোনো স্লোগান দিয়ে নতুন বাস্তবতা বোঝা যাবে না।

বাংলাদেশের নতুন বাম রাজনীতিকে ভাবতে হবে—

AI ও automation-এর শ্রমবাজার,

গিগ economy,

প্ল্যাটফর্ম শ্রমিক,

জলবায়ু উদ্বাস্তু,

খাদ্য নিরাপত্তা,

ভূমি অধিগ্রহণ,

নগর দরিদ্র,

স্বাস্থ্য ব্যয়,

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ,

ডিজিটাল নজরদারি,

করপোরেট কৃষি,

খাদ্য ও ওষুধের বাজার,

এবং রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির নতুন অর্থনীতি নিয়ে।

অর্থাৎ বাম রাজনীতিকে আবার মানুষের জীবনে ফিরতে হবে।

মার্কসের বই থেকে রাস্তায়।

সেমিনার থেকে কারখানায়।

কমিটি থেকে গ্রামে।

স্লোগান থেকে মানুষের দৈনন্দিন অর্থনীতিতে।

১৯. এবং এখানেই মেঘমল্লারদের প্রশ্ন

মেঘমল্লারদের বলা যাবে না—

‘আরও ত্যাগ করো।’

প্রশ্ন হলো—

কেন ত্যাগ করবে?

কী পরিবর্তন হবে?

কে পরিবর্তন করবে?

কীভাবে করবে?

কতদিনে করবে?

তার নিজের জীবনের সঙ্গে সেই পরিবর্তনের সম্পর্ক কী?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে না পারলে বিপ্লবী রাজনীতি কেবল রোমান্টিক নৈতিকতার চর্চা হয়ে যায়।

কর্মী তখন মানুষ নয়—

একটি রাজনৈতিক সম্পদ।

আর রাজনৈতিক সম্পদ যখন ব্যবহৃত হয় কিন্তু রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না, তখন কর্মীর ভেতরেই জন্ম নেয় গভীর হতাশা।

২০. শেষ কথা: মেঘমল্লারদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আগে বাম রাজনীতিকে আত্মসমালোচনা করতে হবে

মেঘমল্লারের আত্মহত্যার চেষ্টার জন্য কোনো দল, কোনো নেতা বা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে দায়ী করা এখনই সম্ভব নয়।
তার ব্যক্তিগত সংকটের প্রতি সম্মান রাখতে হবে।
তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু ঘটনাটি যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, সেটি চাপা দেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতিকে এখন নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—

কেন আমরা জনগণের নামে রাজনীতি করি, অথচ জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারি না?

কেন শ্রমিকের নামে রাজনীতি করি, অথচ শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব হারাই?

কেন বিপ্লবের কথা বলি, অথচ নিজের সংগঠনেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি না?

কেন সাম্য চাই, অথচ নেতৃত্ব ও কর্মীর মধ্যে ক্ষমতার দূরত্ব তৈরি হয়?

কেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলি, অথচ নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতার হিসাব প্রকাশ করি না?

কেন ডানপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলি, অথচ কখনো কখনো ডান বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতিতে আটকে যাই?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

যে তরুণেরা একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে বাম রাজনীতিতে আসে, তাদের সামনে আমরা কি সত্যিই একটি বাস্তব ভবিষ্যৎ তৈরি করছি?

মেঘমল্লারের ঘটনা এই প্রশ্নটিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বাইরে নিয়ে গেছে।

তিনি একটি ব্যক্তি।

কিন্তু তার মতো আরও অনেক তরুণ আছে।

তারা এখনো মিছিলে যায়।

তারা এখনো স্লোগান দেয়।

তারা এখনো বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে।

কিন্তু তাদের ভেতরে যদি ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জন্মায়—

‘এই রাজনীতি কোথাও যাচ্ছে না’—

তাহলে বাম রাজনীতির সংকট আর শুধু নির্বাচনী থাকবে না।

তা হয়ে উঠবে অস্তিত্বের সংকট।

একটি বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয় তখনই ঘটে না, যখন সে নির্বাচনে হারে।

সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয় ঘটে—

যখন তার নিজের কর্মীরাই ভবিষ্যৎ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়।

মেঘমল্লারদের তাই শুধু বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্ন নয়।

প্রশ্ন হলো—

তাদের বেঁচে থাকার মতো একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি বাংলাদেশে তৈরি করা যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর বাম নেতৃত্বকে এখনই দিতে হবে।