বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাজে যাতায়াত করে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে। ঈদ মৌসুমে এই চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একজন বাস চালক, সহকারী বা ট্রাক শ্রমিক অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক ১২–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সুপারিশ অনুযায়ী নিয়মিত কর্মঘণ্টা সাধারণত ৮ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়। দীর্ঘ সময় কাজ করা কেবল শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে না, এটি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। যেখানে এ ধরনের ঝুকিপূর্ণ কাজে ৪/৬ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৩/৪ দিনের বেশী করার সুযোগ নেই সেখানে বাংলাদেশের পরিবহন শ্রমিকরা কাজ করে ১২/১৬ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৭ দিন।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চালকের ক্লান্তি ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাকে বহু গবেষণায় চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা প্রায়ই “নিরাপদ সড়ক চাই” বলি, কিন্তু যারা সেই সড়কে প্রতিদিন মানুষের জীবন বহন করেন, তাদের জীবন যদি এতটা অনিরাপদ হয়, তাহলে নিরাপদ সড়কের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
পরিবহন শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো স্থায়ী বেতন কাঠামোর মধ্যে নেই। অনেকে ট্রিপভিত্তিক আয় করেন, ফলে কাজ না করলে আয়ও নেই। তাদের জন্য ঈদ মানে প্রায়ই পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো নয়; বরং অতিরিক্ত চাপ, অতিরিক্ত যাত্রী এবং অতিরিক্ত কাজ। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি বহু চাকরিজীবী উৎসব বোনাস পান। কিন্তু যাদের পরিশ্রমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে, তাদের বড় অংশ এই সুবিধার বাইরে।
এখানে আরেকটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের অংশ দীর্ঘদিন ধরেই বেশি। ভ্যাট, শুল্ক এবং ভোগ্যপণ্যের ওপর আরোপিত বিভিন্ন কর দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কারণ একজন ধনী ও একজন শ্রমিক একই পণ্যের ওপর সমান ভ্যাট দিলেও, আয়ের তুলনায় শ্রমিকের ওপর করের বোঝা অনেক বেশি পড়ে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের অবদান কেবল শ্রমের মাধ্যমে নয়, ভোগের মাধ্যমেও বড়।
তবুও অর্থের প্রবাহ উল্টো দিকে। যারা উৎপাদন করে, যারা পরিবহন করে, যারা মাঠে কাজ করে, যারা শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখে—তাদের আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
সরকার যদি ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের জন্য উৎসব ভাতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের মতো ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তাহলে এর সুফল শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে চালকদের কর্মচাপ কমবে, সড়কে ক্লান্তিজনিত ঝুঁকি কমবে, সেবার মান বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
নিরাপদ সড়ক শুধু উন্নত রাস্তা বা কঠোর আইনের মাধ্যমে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় নিরাপদ মানুষের মাধ্যমে। যে মানুষের হাতে হাজারো যাত্রীর জীবন প্রতিদিন তুলে দেওয়া হয়, তার নিজের জীবন ও অধিকারকে নিরাপদ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।
