কর না দিয়েই কাঁচামাল আমদানি, অডিট-নির্ভর মেয়াদি বন্ড; ভেতরে ভেতরে বিধির বদল, হঠাৎ হঠাৎ সুবিধার বিস্তার— আড়ালে কী?
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
শুল্ক-কর না দিয়েই কাঁচামাল আমদানি। সেই কাঁচামাল রাখা যাবে অনুমোদিত বন্ডেড ওয়্যারহাউসে। উৎপাদনের পর পণ্য রপ্তানি হলে হিসাব মেলানোর কথা। কিন্তু কোনো পণ্য রপ্তানি না হলে, হিসাব নিষ্পত্তি না হলে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই যদি মাঠপর্যায়ে পাওয়া না যায়— তখন সরকারের রাজস্বের কী হবে?
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের প্রকাশ্য তথ্যব্যবস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) একের পর এক প্রজ্ঞাপন-সংশোধন বিশ্লেষণ করলে এমন একটি ব্যবস্থার চিত্র পাওয়া যায়, যেখানে একদিকে বিপুল কর-সুবিধা, অন্যদিকে বহুস্তরীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; কিন্তু প্রকৃত রাজস্ব ঝুঁকির পূর্ণ চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে এক জায়গায় নেই।
বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে Active Bond License-এর পাশাপাশি Suspended, BIN Lock, GB Lock, Close Bond License, Cancel/Repeal, No-existence এবং Demand— আলাদা আলাদা তালিকা রাখা হয়েছে। কমিশনারেটের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তথ্য Name বা BIN দিয়ে যাচাই করে আমদানি-রপ্তানি ও LC-সংক্রান্ত ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্য রয়েছে।
প্রশ্ন হলো— এই তালিকাগুলোতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে ধরলে চট্টগ্রামের বন্ড ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ, আর কত টাকার রাজস্ব এর সঙ্গে জড়িত?

কর-সুবিধা: ১৫ বছর আগে ছিলো ৬০ হাজার কোটি টাকার হিসাব
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— নির্দিষ্ট শর্তে রপ্তানিমুখী শিল্প শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায়।
সরকারি পুরোনো হিসাবে দেখা যায়, বন্ড সুবিধায় কর-সুবিধার পরিমাণ দ্রুত বেড়েছিল।
| অর্থবছর | বন্ড সুবিধায় কর-সুবিধা |
|---|---|
| ২০০৮-০৯ | ১৫,২২৩.৭২ কোটি টাকা |
| ২০০৯-১০ | ২০,২৭৭.৪০ কোটি টাকা |
| ২০১০-১১ | ২৫,০৭১.৯৫ কোটি টাকা (এপ্রিল পর্যন্ত) |
| মোট | ৬০,৫৭৩.০৭ কোটি টাকা |
তবে শেষ সংখ্যাটি পুরো ২০১০-১১ অর্থবছরের নয়— এপ্রিল পর্যন্ত। তাই তিনটি সংখ্যাকে পূর্ণ অর্থবছরের সমতুল্য ধরে তুলনা করা যাবে না।
তারপরও মাত্র আড়াই অর্থবছরের কাছাকাছি সময়ের এই হিসাব একটি বিষয় পরিষ্কার করে— বন্ড সুবিধা কোনো ছোটখাটো করছাড় নয়; এটি রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নঃ
২০১১-১২ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত বন্ড সুবিধায় সরকারের মোট কর-ব্যয় কত?
NBR-এর বর্তমান প্রকাশ্য Customs SRO ও Bond-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে নিয়মকানুনের বিস্তৃত তথ্য থাকলেও এই পুরোনো সিরিজের ধারাবাহিক অর্থবছরভিত্তিক কর-ব্যয়ের সংখ্যা এক জায়গায় পাওয়া যায় না। ফলে বন্ড ব্যবস্থার প্রকৃত আর্থিক আকার নিয়ে একটি বড় তথ্যঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে শুধু ‘Active’ গুনলে ভুল হবে
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিক অবস্থায় দেখানো হয়।
| স্ট্যাটাস | অনুসন্ধানের অর্থ |
|---|---|
| Active Bond License | কার্যকর লাইসেন্স |
| Suspended Bond | স্থগিত প্রতিষ্ঠান |
| BIN Lock | BIN-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ |
| GB Lock | General Bond-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ |
| Close Bond License | বন্ধ লাইসেন্স |
| Cancel/Repeal | বাতিল/রহিত |
| No-existence | অস্তিত্ব না পাওয়ার তালিকা |
| Demand List | রাজস্ব দাবির আওতায় থাকা |
এই তালিকাগুলো আলাদা করে রাখার অর্থই হলো— বন্ড প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি একমাত্র লাইসেন্সের কার্যকারিতা দিয়ে বিচার করা যায় না।
একটি প্রতিষ্ঠান Active তালিকায় আছে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তার BIN status, General Bond status, Demand এবং মাঠপর্যায়ে অস্তিত্ব।
বর্তমানে ওয়েবসাইটের প্রকাশ্য DataTable-এ এসব তালিকার পূর্ণ সারি/মোট সংখ্যা সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান না হওয়ায় চট্টগ্রামের মোট Active বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নির্ভুল সংখ্যা প্রকাশ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে NBR/কমিশনারেটের মূল ডেটাবেস থেকে পূর্ণ তালিকা চাওয়া জরুরি।

২০২৪: বন্ড ব্যবস্থায় একসঙ্গে নতুন নিয়ম
বন্ড ব্যবস্থার গভীরে যাওয়ার জন্য ২০২৪ সালটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
৬ জুন ২০২৪ NBR নতুন করে জারি করে—
- General Bond Rules, 2024
- Bonded Warehouse Licensing Rules, 2024
- Warehouse-এ পণ্য সংরক্ষণের মেয়াদ সংক্রান্ত বিধি
- Direct ও Deemed Export-oriented প্রতিষ্ঠানের Annual Import Entitlement Rules
- Temporary Import Rules
NBR-এর Customs SRO তালিকায় General Bond Rules-এর নতুন SRO হিসেবে 210-AIN/2024/62/Customs এবং Bonded Warehouse Licensing Rules-এর জন্য 209-AIN/2024/61/Customs তালিকাভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ বন্ড ব্যবস্থায় শুধু লাইসেন্স দেওয়ার বিষয় নয়— কে কতটুকু আমদানি করবে, পণ্য কোথায় থাকবে, কতদিন থাকবে এবং কোন শর্তে সুবিধা পাবে— সবকিছুকে আলাদা নিয়মের মধ্যে আনা হয়েছে।
General Bond Rules-এর কাঠামোয় অডিটের গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে আসে।
অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদের General Bond সুবিধা পাওয়ার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অডিট-সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্সের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে অডিট বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে সমস্যা থাকলে বন্ডের মেয়াদ সীমিত করার সুযোগও বিধিতে রয়েছে।
এখানে চট্টগ্রাম কমিশনারেটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন দাঁড়ায়—
কত প্রতিষ্ঠানের অডিট হালনাগাদ?
কত প্রতিষ্ঠানের অডিট বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন?
কত প্রতিষ্ঠানকে সীমিত মেয়াদের General Bond দেওয়া হয়েছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ—
অডিটে অনিয়ম ধরা পড়ার পরও কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে বন্ড সুবিধা পাচ্ছে?
এই তথ্যগুলো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রকাশ না হলে বন্ডের ঝুঁকি মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
হঠাৎ হঠাৎ বদলাচ্ছে নিয়ম
২০২৬ সালেও বন্ড ব্যবস্থায় একের পর এক সংশোধন এসেছে।
১১ জুন ২০২৬ একসঙ্গে NBR-এর Customs SRO তালিকায় General Bond Rules, Warehouse Licensing Rules, Bonding Times Rules, Direct and Deemed Rules এবং Direct/Deemed Entitlement Rules সংশোধনের তথ্য প্রকাশিত হয়।
এখানেই শেষ নয়।
একই সময়ে Direct and Indirect Export-oriented Rules, 2026 নতুন করে জারি হয়েছে। Bonded Warehouse Gold Jewellery Export Rules, 2026-ও নতুনভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। Customs Risk Management Rules, 2025-এও সংশোধন এসেছে।
অর্থাৎ ২০২৬ সালে শুধু বন্ডের সুবিধা নয়— বন্ড, গুদাম, আমদানি-প্রাপ্যতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের নিয়ম— একাধিক স্তরে একই সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে।
General Bond-এর আওতাও বদলেছে
৮ জুন ২০২৬-এর SRO No. 208-Ain/2026/63/Customs-এর মাধ্যমে General Bond Rules, 2024 সংশোধন করা হয়েছে। NBR-এর অফিসিয়াল তালিকায় এটিকে General Bond Rules, 2024-এর amendment হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সংশোধিত কাঠামোতে নির্দিষ্ট রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য General Bond সুবিধার আওতা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এর ফলে বন্ড সুবিধা ব্যবস্থাকে শুধু ‘গার্মেন্টসের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল’ হিসেবে দেখা আরও অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।
কারণ সময়ের সঙ্গে সুবিধা ও বিধির আওতা পরিবর্তিত হচ্ছে।
সুবিধা বাড়ছে— তাহলে নজরদারি কি একই হারে বাড়ছে?
আমদানি-প্রাপ্যতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অদৃশ্য সংখ্যা
বন্ড ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু ইচ্ছামতো কাঁচামাল আমদানি করতে পারে না। Annual Import Entitlement বা আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণের জন্য পৃথক বিধিমালা রয়েছে।
NBR ২০২৬ সালেও Direct and Deemed Entitlement Rules, 2024 সংশোধন করেছে— SRO 202-Ain/2026/57/Customs।
তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বোঝার জন্য শুধু তার লাইসেন্স দেখা যথেষ্ট নয়।
দরকার—
বার্ষিক অনুমোদিত আমদানি প্রাপ্যতা
বনাম
বাস্তবে আমদানি
বনাম
রপ্তানির পরিমাণ
বনাম
অনিষ্পন্ন বন্ড-দায়।
এই চারটি সংখ্যা পাশাপাশি না বসালে বোঝা যাবে না কোনো প্রতিষ্ঠান বাস্তবে কতটুকু বন্ড সুবিধা ব্যবহার করছে।
বন্ড ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হলো পণ্য সংরক্ষণের সময়।
২০২৪ সালে Warehouse-এ পণ্য সংরক্ষণের মেয়াদ নিয়েও পৃথক বিধি করা হয়। ২০২৬ সালের ১১ জুন Bonding Times Rules, 2024-এও সংশোধন আনা হয়েছে।
এ কারণে চট্টগ্রামের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা হলো—
কোন প্রতিষ্ঠানের গুদামে কত টাকার বন্ডেড কাঁচামাল কতদিন ধরে পড়ে আছে?
যে প্রতিষ্ঠানের পণ্য স্বল্প সময়ের মধ্যে উৎপাদনে গিয়ে রপ্তানি হওয়ার কথা, সেখানে যদি বছরের পর বছর পণ্য পড়ে থাকে, তাহলে সেটি আলাদা ঝুঁকি।
বন্ড সুবিধার বিপরীতে General Bond একটি আর্থিক দায়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত।
চট্টগ্রাম কমিশনারেটের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী General Bond-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত বন্ডের অঙ্ক রয়েছে।
| প্রতিষ্ঠানের ধরন | General Bond-এর অঙ্ক |
|---|---|
| Deemed Exporter | ১ কোটি টাকা |
| Direct Exporter—Knit/Woven/Sweater | ৩ কোটি টাকা |
| Direct + Deemed Exporter | ২ কোটি টাকা |
| Diplomatic/Duty Free/Duty Paid | ৩ কোটি টাকা |
এখানে আরও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—
একটি প্রতিষ্ঠানের General Bond-এর অঙ্ক যদি কয়েক কোটি টাকা হয়, তার বিপরীতে বছরে কত টাকার শুল্ক-কর সুবিধা ব্যবহার করছে?
যদি আমদানি-প্রাপ্যতা, প্রকৃত আমদানি এবং General Bond-এর অঙ্ক পাশাপাশি প্রকাশ করা হয়, তাহলে ঝুঁকি বিশ্লেষণ অনেক বেশি কার্যকর হবে।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে পৃথক Demand List রয়েছে।
Demand থাকা মানেই কোনো প্রতিষ্ঠান অপরাধ করেছে— এমন সিদ্ধান্ত অবশ্যই দেওয়া যাবে না। রাজস্ব দাবির কারণ ও আইনি অবস্থান আলাদা বিষয়।
কিন্তু অনুসন্ধানের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ:
Demand-এ থাকা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বন্ড স্ট্যাটাস কী?
তার BIN কি Active?
নাকি Locked?
তার General Bond কি কার্যকর?
সে কি নতুন করে raw material release-এর NOC পেয়েছে?
সে কি Inter-Bond Transfer করেছে?
তার অডিটের অবস্থা কী?
এই তথ্যগুলো একত্র করলে একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব
No-existence List-ও আলাদা করে রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ এমন প্রতিষ্ঠান আছে যাদের অস্তিত্ব নিয়ে কমিশনারেটের ডেটাবেসে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এখানে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
যে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মাঠপর্যায়ে নেই, তার নামে আগে কত টাকার বন্ড সুবিধা ব্যবহার হয়েছে?
তার নামে কত কাঁচামাল আমদানি হয়েছে?
কতটুকু রপ্তানি দেখানো হয়েছে?
কোন ব্যাংক তার Lien Bank ছিল?
কোন C&F আমদানি ছাড়িয়েছে?
এবং তার নামে কোনো Demand তৈরি হয়েছে কি না?
এগুলোই হতে পারে বন্ড ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান।
?
একইভাবে BIN Lock List-ও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ BIN একটি প্রতিষ্ঠানের VAT-সংক্রান্ত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বন্ড লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠানের BIN যদি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসে, সেটি ঝুঁকি বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
তবে BIN Lock = রাজস্ব ফাঁকি প্রমাণিত—এমন সরল সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রয়োজন হলো Lock-এর কারণ, সময়কাল এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানা।
বন্ধ
Close Bond License এবং Cancel/Repeal List-ও একইভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।
একটি প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ হলো?
নিজে আবেদন করেছে?
অডিটে অনিয়ম?
রপ্তানি বন্ধ?
রাজস্ব দাবি?
লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ?
নাকি ব্যবসাই বন্ধ?
প্রতিটি কারণ আলাদা করে না দেখলে ‘Cancelled’ শব্দটি শুধু একটি প্রশাসনিক তথ্য হয়ে থাকবে।
কিন্তু কারণের সঙ্গে আমদানি ও রাজস্বের তথ্য জুড়ে দিলে সেটিই হয়ে উঠবে অনুসন্ধানের উপাদান।
চট্টগ্রাম কমিশনারেটের সাম্প্রতিক নথিতেও বন্ড সুবিধার ব্যবহার অব্যাহত থাকার প্রমাণ রয়েছে।
২০২৬ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত কাঁচামাল release NOC, bank guarantee release, FOC raw material import availability এবং Inter-Bond Transfer-সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ বন্ড ব্যবস্থাটি পুরোনো কোনো নিষ্ক্রিয় প্রশাসনিক কাঠামো নয়; প্রতিদিনের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় এর বাস্তব আর্থিক প্রভাব রয়েছে।
NBR-এর ২০২৬ সালের Customs SRO তালিকাতেও General Bond, Entitlement, Bonding Times, Warehouse Licensing এবং Direct/Deemed Export Rules—সবগুলোতেই সংশোধনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে একসময় লক্ষ্য ও আদায়ের মধ্যেও ওঠানামা দেখা যায়।
| অর্থবছর | লক্ষ্যমাত্রা | আদায় |
|---|---|---|
| ২০১৬-১৭ | ২৯০.০০ কোটি | ৩১৭.৮৬ কোটি |
| ২০১৭-১৮ | ৩৬৬.২১ কোটি | ৩৯৪.৬৭ কোটি |
| ২০১৮-১৯ | ৫১৮.৯৭ কোটি | ৩৯৩.৯৮ কোটি |
শেষ অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ৫১৮.৯৭ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় দাঁড়ায় ৩৯৩.৯৮ কোটি টাকা— অর্থাৎ লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
এটি সরাসরি বন্ড সুবিধার কারণে হয়েছে— এমন দাবি করা যাবে না। কারণ রাজস্ব আদায় বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সূচক এবং বন্ড কমিশনারেটের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সমস্যা কোথায়— সুবিধায়, নাকি নজরদারিতে?
বন্ড সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়।
বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পের বড় অংশই এই সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। শুল্ক-কর দিয়ে আগে কাঁচামাল আমদানি করে পরে ফেরত পাওয়ার বদলে বন্ড ব্যবস্থা উৎপাদন ও নগদ প্রবাহে সহায়তা করে।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত অন্য জায়গায়—
যে প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে রপ্তানি করছে, তাকে দ্রুত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না।
আর যে প্রতিষ্ঠান সুবিধা নিয়ে হিসাব দিচ্ছে না, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কত দ্রুত হচ্ছে।
অর্থাৎ ভালো প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত সেবা এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারি— দুই ব্যবস্থাই একসঙ্গে দরকার।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে তথ্য আছে। NBR-এর ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপন আছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের NOC, Transfer, Guarantee Release-এর নথিও আছে।
কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক বা সাংবাদিকের জন্য এক জায়গায় নেই—
প্রতিষ্ঠান → BIN → Bond Status → Import Entitlement → Actual Import → Export → Audit → Demand → General Bond → Bank Guarantee
এই পুরো চেইন।
ফলে তথ্য আছে, কিন্তু ঝুঁকির পূর্ণ ছবি নেই।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে এখন প্রয়োজন একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ডেটাবেস।
| যে তথ্য দরকার | কেন দরকার |
|---|---|
| মোট Bond License | আকার বোঝার জন্য |
| Active | বর্তমানে সুবিধাভোগী |
| Suspended | প্রশাসনিক ঝুঁকি |
| BIN Lock | VAT/Compliance সংকেত |
| GB Lock | Bond compliance সংকেত |
| Cancelled | লাইসেন্সের পরিণতি |
| No-existence | অস্তিত্বের ঝুঁকি |
| Demand | রাজস্ব দাবি |
| Annual Entitlement | অনুমোদিত আমদানি |
| Actual Import | প্রকৃত সুবিধা |
| Export | সুবিধার বিপরীতে ফল |
| Audit status | হিসাব নিষ্পত্তি |
| General Bond | আর্থিক নিশ্চয়তা |
| Bank Guarantee | দায় সুরক্ষা |
এর সঙ্গে যুক্ত হবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আমদানি-রপ্তানি ও Demand-এর অঙ্ক।
তখনই বোঝা যাবে—
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটে আসলে কত প্রতিষ্ঠান, কতটি ঝুঁকিতে এবং কত টাকার রাজস্ব সেই ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত।
ভেতরে ভেতরে বিধি বদলায়, হঠাৎ হঠাৎ সুবিধা বাড়ে— আড়ালে কী?
২০২৪ সালে নতুন করে বন্ড ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা। ২০২৫ সালে সংশোধন। ২০২৬ সালের জুনে General Bond, Warehouse Licensing, Bonding Times, Entitlementসহ একাধিক বিধিতে পরিবর্তন। এরপর আগস্ট ২০২৬-এও Direct and Deemed Entitlement, Direct and Deemed Rules এবং Direct/Indirect Export-oriented Rules-এ নতুন সংশোধন দেখা যাচ্ছে।
বিধি পরিবর্তন নিজেই কোনো অনিয়ম নয়। বরং শিল্পের প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, LDC graduation এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে আইন ও বিধি পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে একটি প্রশ্ন থাকা দরকার—
সুবিধা কতটা বাড়ল এবং নজরদারি কতটা শক্ত হলো?
কারণ বন্ড সুবিধায় সরকার আগে কর নেয় না।
তাই এটি মূলত একটি বিশ্বাসভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থা।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে পণ্য ঢুকতে দেয়। প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে পণ্য ব্যবহার করতে দেয়। তারপর রপ্তানির মাধ্যমে হিসাব মেলানোর সুযোগ দেয়।
এই বিশ্বাসের বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা হলো—
সঠিক ডেটা, নিয়মিত অডিট, কার্যকর মাঠপর্যায়ের নজরদারি এবং দ্রুত রাজস্ব আদায়।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের সামনে এখন তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন লাইসেন্স কতটি— তা নয়।
প্রশ্ন হলো, কর না দিয়ে ঢোকা প্রতিটি টাকার কাঁচামালের শেষ হিসাব কি রাষ্ট্রের কাছে আছে?
আর যদি থাকে—
সেই হিসাবটি প্রকাশ্যে নেই কেন?
