Headlines

ঢাকা দক্ষিণ বন্ডে ৪,১৯৪ প্রতিষ্ঠান— নিষ্ক্রিয় ২,৫৬৬

সক্রিয় মাত্র ১,৬২৮; বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল, বিআইএন লকড কিংবা অস্তিত্বহীন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রপ্তানিমুখী শিল্পে শুল্কমুক্ত বা সুবিধাপ্রাপ্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে দেওয়া বন্ড লাইসেন্সের বড় একটি অংশই এখন কার্যত অচল। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কমিশনারেটটির আওতায় মোট ৪,১৯৪টি বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় লাইসেন্স ১,৬২৮টি, আর ২,৫৬৬টি লাইসেন্স নিষ্ক্রিয়। অর্থাৎ মোট লাইসেন্সের প্রায় ৬১ শতাংশই বর্তমানে নিষ্ক্রিয়

সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শ্রেণিভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের আওতায় সরাসরি রপ্তানিমুখী (Direct Export Bond), প্রচ্ছন্ন রপ্তানিমুখী (Deemed Bond), এক্সপোর্ট প্রসেসিং বন্ড, সুপারভাইজড বন্ড, হোম কনজাম্পশন বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স রয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ সরাসরি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের।

৪,১৯৪ লাইসেন্সের মধ্যে কোন খাতে কত

বন্ডের ধরন সক্রিয় নিষ্ক্রিয় মোট
Direct Export Bond (GB) ৮৩৩ ১,৯৭২ ২,৮০৫
Deemed Bond (DB) ৫৬১ ৪৯৬ ১,০৫৭
Export Processing Bond (EZ) ১৫৯ ৪৬ ২০৫
Supervised Bond (SB) ৪২ ৩২ ৭৪
Home Consumption Bond (HB) ২০ ২৯
Diplomatic Bond (PB)
Duty Free Shop (DF) ১৫ ১৫
BEZA (BZ)
সর্বমোট ১,৬২৮ ২,৫৬৬ ৪,১৯৪

তথ্য বলছে, নিষ্ক্রিয় লাইসেন্সের সবচেয়ে বড় অংশ Direct Export Bond শ্রেণিতে। এই শ্রেণিতে ২,৮০৫টি লাইসেন্সের বিপরীতে নিষ্ক্রিয় ১,৯৭২টি। অর্থাৎ এই শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ লাইসেন্সই সক্রিয় নয়।

ARO
কাস্টমস্ বন্ডে মাঠ পর্যায়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনাব হাসানুজ্জামান একজন দক্ষ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। ছবিঃ ফাইল ফটো

নিষ্ক্রিয়তার পেছনে কী?

নিষ্ক্রিয় ২,৫৬৬টি লাইসেন্সকে আবার বিভিন্ন অবস্থায় ভাগ করেছে বন্ড কমিশনারেট। এর মধ্যে ২,২৪৯টি লাইসেন্স স্থগিত, ৭০টির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, ৫৪২টি বাতিল, ২,৫২৭টির BIN Locked, ৫৮৯টি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না এবং ৪৭৩টি প্রতিষ্ঠান ২০২ ধারার আওতায় রয়েছে। একটি লাইসেন্স একই সঙ্গে একাধিক স্ট্যাটাসের আওতায় থাকতে পারে— তাই এসব সংখ্যার যোগফল ২,৫৬৬-এর সঙ্গে মেলানো যাবে না।

Direct Export Bond-এর ক্ষেত্রে সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট। এ শ্রেণিতে ১,৭৫৮টি লাইসেন্স স্থগিত, ৪৬টির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, ৩০৩টি বাতিল, ১,৯৪২টি BIN Locked এবং ৪৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না বলে সরকারি ডাটাবেসে দেখানো হয়েছে।

এতে প্রশ্ন উঠছে— যেসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই অথবা যাদের BIN লকড কিংবা লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত, তাদের বন্ড লাইসেন্সের আওতায় অতীতে কী পরিমাণ কাঁচামাল বা অন্যান্য পণ্য আমদানি হয়েছিল এবং সেসব পণ্যের হিসাব শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে?

RO
একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার অধীনে কাজ করেন কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা।

বন্ড সুবিধায় কী আসে?

বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্য হলো রপ্তানিমুখী শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক রাখা। নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, প্যাকেজিং উপকরণসহ নির্দিষ্ট পণ্য শুল্ক-কর পরিশোধ না করে বা বিশেষ সুবিধায় আমদানি করতে পারে। এসব পণ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা।

ফলে বন্ড ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— কত পণ্য আমদানি হলো, কত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার হলো, কত পণ্য রপ্তানি হলো এবং অবশিষ্ট পণ্যের কী হলো— তার হিসাব।

বন্ড কমিশনারেটের দায়িত্বের মধ্যেই লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কার্যক্রম করছে কি না তা মনিটরিং, লাইসেন্স নবায়ন ও বার্ষিক নিরীক্ষা এবং বন্ডিং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো রয়েছে।

কাস্টমস্ বন্ড কমিশনারেট
একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠান।

ডাটাবেসেই মিলছে নানা ধরনের চিত্র

ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের অনলাইন ডাটাবেসে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক লাইসেন্স, BIN, ঠিকানা, বন্ডের ধরন, স্ট্যাটাস, অডিট ও অন্যান্য তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধান তালিকায় ৪,৭০০-এর বেশি রেকর্ড দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে লিয়েন ব্যাংক-সংক্রান্ত ডাটাবেসে ৪,৫০০-এর বেশি রেকর্ড রয়েছে। সেখানে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পাশে একই সঙ্গে Active, Suspended, No Existence, BIN Locked কিংবা 202-Para-এর মতো একাধিক স্ট্যাটাসও দেখা যাচ্ছে।

অর্থাৎ শুধু লাইসেন্সের সংখ্যা নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব কার্যক্রম, আমদানি, উৎপাদন, রপ্তানি এবং বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের নিষ্পত্তি— সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় ধরনের তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে।

সক্রিয় তালিকায় বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান

কমিশনারেটের সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের তালিকায় পোশাক, টেক্সটাইল, জুতা, চামড়া, অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তালিকায় AKIJ FOOTWEAR, AKIJ SHOES, AKIJ TEXTILE MILLS, ALLIANCE KNIT COMPOSITE, AMANAT SHAH FABRICS, A-TEX LABEL, A. K. LEATHER COMPLEXসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম দেখা যায়।

তবে একই ডাটাবেসে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থগিত, বাতিল, BIN Locked কিংবা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের তথ্যও রয়েছে। ফলে বন্ড ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র বুঝতে শুধু সক্রিয় লাইসেন্সের তালিকা যথেষ্ট নয়; নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অতীত আমদানি ও রপ্তানি হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

৬১ শতাংশ লাইসেন্স নিষ্ক্রিয়— রাজস্ব ঝুঁকি কোথায়?

বন্ড ব্যবস্থা মূলত রপ্তানিকে সহায়তা করার একটি নীতি-সুবিধা। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাওয়ার পর কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে, প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব না থাকলে কিংবা BIN লকড হয়ে গেলে সেই প্রতিষ্ঠানের নামে পূর্বে আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্যের হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে ২,৫৬৬টি নিষ্ক্রিয় লাইসেন্সের মধ্যে ৫৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না— সরকারি ডাটাবেসের এই তথ্য বন্ড ব্যবস্থাপনার তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে অতীতে কত টাকার পণ্য বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়েছে? আমদানি করা কাঁচামালের কত অংশ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে? কতটুকু রপ্তানি হয়েছে? আর অব্যবহৃত বা হিসাববহির্ভূত পণ্যের বিপরীতে সরকারের পাওনা শুল্ক-কর কত?

অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ

বন্ড কমিশনারেটের প্রকাশিত তথ্য শুধু সমস্যার একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র দিচ্ছে। প্রকৃত চিত্র জানতে হলে ২,৫৬৬টি নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি, বন্ড সুবিধায় পাওয়া পণ্যের পরিমাণ, অডিট আপত্তি, SCN বা ডিমান্ড, ব্যাংক হিসাব, লাইসেন্স স্থগিতের কারণ এবং সরকারি পাওনার তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে No Existence, BIN Locked, Cancelled, Suspended এবং 202-Para স্ট্যাটাস রয়েছে, সেগুলোর পৃথক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যেতে পারে— নিষ্ক্রিয় লাইসেন্সগুলো কেবল ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক ফল, নাকি এর সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কিংবা দুর্বল তদারকির কোনো যোগসূত্র রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের সরকারি ডাটাবেসে থাকা এই ৪,১৯৪টি লাইসেন্স তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা নয়; এটি দেশের বন্ড সুবিধা, আমদানি-রপ্তানি এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ঝুঁকির একটি বড় চিত্র।