Headlines

বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি, পেপার ব্যাগে রপ্তানি— ডিএম প্যাকেজিংয়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

বন্ড কমিশনারেট

ঢাকার ধামরাইয়ের মেসার্স ডিএম প্যাকেজিংয়ের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কাঁচামাল আমদানি ও পেপার ব্যাগ রপ্তানির বড় ধরনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনের জন্য ‘সহগ’ নির্ধারণের তথ্যও রয়েছে। ফলে বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের পরিমাণ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং রপ্তানি হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না— তা যাচাইয়ের দাবি উঠছে।

বন্ড কমিশনারেট
ডিএম প্যাকেজিং বর্তমানে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মেহেদী আল মামুনের তদারকিতে রয়েছে।

ঢাকার ধামরাইয়ের বারিগাঁও এলাকায় অবস্থিত D M Packaging আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেটায় নিয়মিত আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নামে ২৬টি আমদানি চালান এবং ৪৫টি রপ্তানি চালানের তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে আমদানির বাণিজ্য মূল্য প্রায় ১.২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রপ্তানির মূল্য প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫০ ডলার হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এর আগের দীর্ঘ সময়ের ডেটাতেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের চিত্র পাওয়া যায়। জানুয়ারি ২০২২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক ট্রেড ডেটাবেসে D M Packaging-এর ১৪৮টি আমদানি ও ১৪৮টি রপ্তানি চালানের তথ্য রয়েছে। ওই সময় আমদানির মোট বাণিজ্য মূল্য প্রায় ৪.৪৩ মিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানির মূল্য প্রায় ৮৩৩,৮২০ ডলার দেখানো হয়েছে।

কাঁচামালের তালিকায় Glassine Paper

প্রতিষ্ঠানটির আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য পণ্য Glassine Paper। ট্রেড ডেটায় HS Code 480640-এর অধীনে Glassine Paper আমদানির তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বরের একটি রেকর্ডে D M Packaging-এর নামে ২৫,১৮০ কেজি Glassine Paper আমদানির তথ্য রয়েছে। একই ডেটাসেটে একই তারিখে একই পণ্যের একাধিক রেকর্ডও দেখা যাচ্ছে।

এ ধরনের কাঁচামাল সাধারণত প্যাকেজিং ও কাগজজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে বন্ড সুবিধায় এ ধরনের কাঁচামাল আমদানি করা হলে তার বিপরীতে নির্ধারিত উৎপাদন, ব্যবহার, অপচয় এবং রপ্তানির হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শুধু আমদানি নয়, উৎপাদনের ‘সহগ’ও নির্ধারিত

D M Packaging-এর বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সূত্র পাওয়া যাচ্ছে ডিউটি এক্সাইজ ও ডিডাকশন অফিস (DEDO)-এর সহগ-সংক্রান্ত তালিকায়।

সরকারি তালিকায় “এ(৭)/ডেডো/সহগ/ডিএম প্যা/২০২২/২৩৭/১৭৩” নম্বরের একটি নথিতে D. M. Packaging-এর নাম রয়েছে। নথিটির তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

‘সহগ’ গুরুত্বপূর্ণ কারণ বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে কত পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য পাওয়া যাবে —এ ধরনের হিসাব নির্ধারণে এটি ব্যবহার করা হয়।

অর্থাৎ D M Packaging-এর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কেবল কত টাকার কাঁচামাল আমদানি হয়েছে তা নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে—

কত কাঁচামাল আনা হয়েছে, সেই কাঁচামাল থেকে সহগ অনুযায়ী কত পণ্য উৎপাদন হওয়ার কথা, বাস্তবে কত উৎপাদন হয়েছে এবং সেই উৎপাদিত পণ্যের কত অংশ রপ্তানি হয়েছে?

পেপার ব্যাগই মূল উৎপাদন পণ্যের একটি বড় অংশ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেটায় D M Packaging-এর রপ্তানির ক্ষেত্রে HS Code 4819-এর পণ্য পাওয়া যায়। এই শ্রেণির মধ্যে কাগজ বা পেপারবোর্ডের বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং পণ্য পড়ে।

আরও নির্দিষ্টভাবে, প্রতিষ্ঠানটির নামে Printed Paper Bag এবং Mango Paper Bag রপ্তানির রেকর্ড রয়েছে।

একটি রেকর্ডে ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি “MANGO PAPER BAG (PRINTED)” ১ লাখ ৮৪ হাজার পিস রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের ৬ মে-র আরেকটি রেকর্ডে Printed Paper Bag রপ্তানির তথ্য রয়েছে।

অর্থাৎ কাঁচামাল হিসেবে কাগজজাত পণ্য আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য হিসেবে পেপার ব্যাগ রপ্তানি— দুই দিকের বাণিজ্যিক প্রবাহের মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

দেশীয় বাজারেও সরবরাহের তথ্য

প্রকাশ্য ট্রেড ডেটায় D M Packaging-এর পেপার ব্যাগের সরবরাহ শুধু বিদেশি বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্রেতার কাছেও সরবরাহের তথ্য দেখা যায়।

Volza-এর ডেটায় D M Packaging Barigaon Dhamrai Dh-এর ৩৬টি Paper Bag export shipment এবং ৮ জন buyer-এর তথ্য রয়েছে। একই ডেটায় Deshbandhu Textile Mills Limited-এর কাছে Printed Paper Bag সরবরাহের রেকর্ডও দেখা যায়।

এখানে ‘export shipment’ শব্দটি ডেটাবেসের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ব্যবহৃত; ফলে প্রতিটি চালানের প্রকৃত শুল্ক-ভ্যাট ও বন্ড স্ট্যাটাস বাংলাদেশ কাস্টমসের মূল নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

বড় প্রশ্নঃ বন্ডের কাঁচামাল কোথায় যাচ্ছে?

বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মূল সুবিধাটি হলো— নির্দিষ্ট শর্তে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল শুল্ক-কর সুবিধায় আমদানি করা যায়।

তাই D M Packaging-এর ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো কাঁচামাল-উৎপাদন-রপ্তানি চেইন

ধরা যাক, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ Glassine Paper বা অন্য কাঁচামাল আমদানি করা হলো। তখন সেই কাঁচামালের বিপরীতে—

  • নির্ধারিত সহগ অনুযায়ী কত পেপার ব্যাগ উৎপাদন হওয়ার কথা;
  • প্রকৃত উৎপাদন কত;
  • উৎপাদনে অনুমোদিত wastage কত;
  • কত পণ্য রপ্তানি হয়েছে;
  • কত পণ্য স্থানীয় বাজারে গেছে;
  • স্থানীয় বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য VAT পরিশোধ হয়েছে কি না;
  • এবং বন্ড রেজিস্টারে কাঁচামালের balance কত দেখানো হয়েছে—

এসব তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

আমদানি ও রপ্তানির মূল্যের ব্যবধানও নজরকাড়া

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকাশ্য ট্রেড ডেটায় প্রতিষ্ঠানটির আমদানি মূল্য প্রায় ১২.৩ লাখ ডলার, বিপরীতে রপ্তানি মূল্য প্রায় ২.৬৫ লাখ ডলার

তবে এই পার্থক্যকে সরাসরি অনিয়মের প্রমাণ বলা যাবে না। কারণ একটি বন্ডেড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও রপ্তানি একই সময়সীমায় বা একই পণ্যমূল্যের ভিত্তিতে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। কাঁচামাল মজুদ, উৎপাদন চক্র, স্থানীয় সরবরাহ, মূল্য সংযোজন, পুরোনো স্টক এবং চালানের সময়ের পার্থক্য— সবই এর কারণ হতে পারে।

তবু বন্ড হিসাব অডিটের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ red flag/verification point

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

Paper Bag supplier হিসেবে D M Packaging-এর উপস্থিতিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেটায় বেশ দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের একটি আপডেটেড ডেটাসেটে বাংলাদেশে Paper Bag সরবরাহকারীদের মধ্যে D M Packaging Barigaon Dhamrai Dh-এর ৩৬টি shipment দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি শুধু কাঁচামাল আমদানি করছে না; একই সঙ্গে প্যাকেজিং পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের একটি সক্রিয় বাণিজ্যিক চেইনের অংশ।

এখন কাস্টমস ও বন্ড কর্তৃপক্ষের কাছে যে প্রশ্নগুলো

D M Packaging নিয়ে প্রকৃত অনুসন্ধান করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অন্তত নিম্নের তথ্য নেওয়া প্রয়োজন—

১. প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান Bond Licence ও BIN status কী?
২. ২০২২ সালের সহগ নথিতে কোন কোন কাঁচামালের বিপরীতে কী উৎপাদন সহগ নির্ধারণ করা হয়েছে?
৩. ২০২২ সালের পর সহগ সংশোধন করা হয়েছে কি না?
৪. ২০২২–২০২৬ সময়ে Glassine Paper ও অন্যান্য কাঁচামালের মোট আমদানি কত?
৫. ওই কাঁচামালের বিপরীতে মোট উৎপাদন কত দেখানো হয়েছে?
৬. মোট রপ্তানি কত এবং কোন কোন ক্রেতার কাছে?
৭. স্থানীয় বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি করা হলে তার VAT treatment কী?
৮. কাঁচামাল ব্যবহারের বিপরীতে wastage কত দেখানো হয়েছে?
৯. বন্ড রেজিস্টারে কাঁচামালের closing balance কত?
১০. সর্বশেষ audit বা inspection-এ কোনো shortage, excess, wastage বা অন্য কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেছে কি না?

অনুসন্ধানের মূল জায়গা এখানেই

প্রকাশ্য তথ্য এখন পর্যন্ত D M Packaging-কে কাঁচামাল আমদানিকারক ও পেপার ব্যাগ উৎপাদন/সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে। সরকারি সহগ নথির অস্তিত্বও নিশ্চিত করে যে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন হিসাবের জন্য একটি নির্ধারিত কাঠামো রয়েছে।

কিন্তু এই তথ্যগুলো একা কোনো শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকি বা অনিয়ম প্রমাণ করে না।

প্রকৃত অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন হবে Bill of Entry + Bond Register + Production Register + Wastage Statement + Export Bill of Entry + স্থানীয় বিক্রির VAT records— এই ছয়টি নথির হিসাব একসঙ্গে বসানো।

এই হিসাব মেলানো গেলেই বোঝা যাবে, বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের প্রতিটি কেজি শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে এবং নির্ধারিত সহগ অনুযায়ী উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।