ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে লাঠিয়াল বাহিনীর চেহারা বারবার বদলেছে। কখনো তারা ছাত্রলীগ-যুবলীগের ব্যানারে মাঠে ছিল, কখনো ছাত্রদল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে। ক্ষমতার পালাবদলে পুরোনো বাহিনী পিছু হটেছে, নতুন বাহিনী সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— লাঠিয়াল বাহিনী কি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছে, নাকি শুধু তার পোশাক বদলেছে?
এই প্রশ্নের সামনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন সামাজিক শক্তির উপস্থিতি চোখে পড়ছে— ‘তৌহিদী জনতা’।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তৌহিদ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নামতেই পারেন। তাই ‘তৌহিদী জনতা’ নামে মাঠে থাকা প্রত্যেক মানুষকে রাজনৈতিক কর্মী, মাফিয়ার লোক কিংবা ভাড়াটে লাঠিয়াল হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
যখন ধর্মীয় আবেগকে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনবল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই আবেগের পেছনে কারা সংগঠক— সেটি জানা জরুরি।
কারণ ধর্মীয় আবেগ আর সেই আবেগকে ব্যবহার করা— দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
লাঠিয়াল বদলায়, মাফিয়াতন্ত্র থাকে
স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি অদৃশ্য কাঠামো বহুদিন ধরেই কাজ করে— ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, ভূমি-দখলদার, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্ক।
এই নেটওয়ার্কের সব সদস্য অপরাধী— এমন দাবি করা যাবে না। কিন্তু যেখানে আইন ও প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর প্রয়োজন হয়, সেখানে মাঠে থাকা একটি অনুগত জনবল অত্যন্ত কার্যকর।
আগে সেই কাজের জন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীবাহিনী ছিল সহজলভ্য।
একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা জানতেন— কোনো জায়গায় কয়েক ডজন লোক প্রয়োজন হলে দলীয় পরিচয়ে তাদের ডাকা যাবে। মিছিল হবে, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো হবে, কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করা হবে, জমি বা ব্যবসায়িক বিরোধে শক্তি প্রদর্শন করা হবে কিংবা কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা হবে।
কিন্তু রাজনৈতিক ক্যাডার ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা আছে।
ক্যাডার একসময় নিজেই ক্ষমতার অংশ হতে চায়।
আজ যে নেতার হয়ে সে মাঠে নামছে, কাল সেই নেতার কাছেই পদ চাইবে। ঠিকাদারি চাইবে। ব্যবসার সুযোগ চাইবে। রাজনৈতিক পরিচয় চাইবে। নিজের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে।
অর্থাৎ লাঠিয়াল একসময় নিজেই সম্ভাব্য ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়।
এখানেই অনানুষ্ঠানিক crowd-এর আকর্ষণ।
নতুন লাঠিয়াল কি কম খরচের?
ধরা যাক— কোনো এলাকায় এমন একদল মানুষ আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত জীবনযাপন করে। তাদের একটি অংশ ধর্মীয় আবেগে সহজেই সংগঠিত হয়। তাদের স্থায়ী রাজনৈতিক পদ নেই, বড় কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নেতৃত্বে ওঠার সুস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষাও নেই।
তাহলে কোনো স্থানীয় ক্ষমতাবানের জন্য তাদের সংগঠিত করা কি তুলনামূলকভাবে সহজ?
এটি একটি অনুসন্ধানযোগ্য প্রশ্ন।
কারণ রাজনৈতিক ক্যাডারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগ দরকার। সংগঠন ধরে রাখতে হয়, পদ দিতে হয়, কর্মীদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়। কিন্তু ইস্যুভিত্তিক crowd-এর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে শুধু—
একটি ইস্যু, কয়েকজন সংগঠক, কিছু প্রচারণা এবং মানুষ জড়ো করার সক্ষমতা।
কাজ শেষ হলে crowd ছত্রভঙ্গ।
এই সম্পর্ককে তাই শুধু ‘বিশ্বস্ততা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি হতে পারে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, সামাজিক পরিচয় এবং স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে স্বার্থের বিনিময়।
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো— যে মানুষটি ব্যবহৃত হচ্ছে, সে হয়তো নিজেই জানে না যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সে মনে করছে, সে ইসলাম রক্ষা করছে।
অন্যদিকে কোনো স্থানীয় রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হয়তো সেই আবেগের আড়ালে নিজের কাজটি সম্পন্ন করছে।
তাহলে পার্থক্য কোথায়?
ছাত্রলীগ, যুবলীগ কিংবা ছাত্রদলের মতো রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা সাধারণত একটি দৃশ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ। তাদের পরিচয় থাকে, নেতৃত্ব থাকে, রাজনৈতিক আনুগত্য থাকে এবং অনেক সময় নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির আকাঙ্ক্ষাও থাকে।
অন্যদিকে ‘তৌহিদী জনতা’ নামে সংগঠিত একটি crowd-এর ক্ষেত্রে পরিচয়টি ধর্মীয়।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত কোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন উঠলেই সেটিকে ‘ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে ধর্মীয় আবেগ হয়ে উঠতে পারে একটি ঢাল, আর সেই ঢালের আড়ালে কাজ করতে পারে অন্য কোনো স্বার্থ।
তবে আবারও বলতে হয়— এটি একটি সম্ভাব্য কাঠামো, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
কে ডাকছে? কে টাকা দিচ্ছে? কে লাভবান হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘তৌহিদী জনতা’কে মাফিয়াদের লাঠিয়াল বাহিনী বলা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে দায়িত্বশীল হবে না।
বরং অনুসন্ধান শুরু করতে হবে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন দিয়ে—
কোনো একটি বিক্ষোভে প্রথম খবরটি কে ছড়িয়েছিল?
কে মানুষ জড়ো করেছিল?
মাইক বা পরিবহনের ব্যবস্থা কে করেছিল?
কারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল?
ঘটনার আগে কার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল?
একই ব্যক্তিরা কি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় বারবার সামনে এসেছে?
ঘটনার পরে কারা সুবিধা পেয়েছে?
কোনো ব্যবসায়িক বিরোধের পর হঠাৎ ধর্মীয় ইস্যু সামনে এসেছে কিনা?
কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সময় ধর্মীয় crowd ব্যবহার করা হয়েছে কিনা?
এমনকি প্রশাসনের কোনো অংশের সঙ্গে তাদের অস্বাভাবিক যোগাযোগ আছে কিনা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে— এটি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় প্রতিবাদ, নাকি ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে তৈরি করা একটি সংগঠিত চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা।
ধর্মের নামে মাফিয়াতন্ত্র?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই।
যদি কোনো গোষ্ঠী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটায়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগীকে সরিয়ে দেয়, জমি দখলের পথ তৈরি করে, সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়— তাহলে সেটি আর নিছক ধর্মীয় আন্দোলন থাকে না।
তখন ধর্ম হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার।
আর এই জায়গায় ইসলামের আদর্শের সঙ্গেও প্রশ্ন তৈরি হয়।
কারণ ইসলাম কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির ওপর অন্যায় ক্ষমতা প্রয়োগের লাইসেন্স দেয় না। ধর্মীয় অনুভূতি কারও সম্পত্তি দখল, কাউকে ভয় দেখানো, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা জনতার শক্তি দিয়ে বিচার করার বৈধতা তৈরি করে না।
তাই তৌহিদী জনতার সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সম্ভবত অন্য কেউ নয়— তাদের নিজেদের কাছেই।
তারা কি সত্যিই ধর্মের নৈতিক আদর্শের প্রতিনিধি? নাকি তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেউ ব্যবহার করছে?
তারা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন? নাকি কারও নির্দেশে একজনের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন?
তারা কি দুর্নীতি, ঘুষ, লুটপাট, দখলদারিত্ব ও প্রতারণার বিরুদ্ধেও একইভাবে রাস্তায় নামবেন?
নাকি ধর্ম, নারী, সংস্কৃতি ও পোশাকের মতো দৃশ্যমান ইস্যুই কেবল তাদের আন্দোলনের ক্ষেত্র?
লাঠিয়ালের পোশাক বদলালেই কি খেলা বদলায়?
বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি হলো— ক্ষমতাবানরা প্রায়ই নিজেদের জন্য জনবল তৈরি করে নেয়।
একসময় সেই জনবলের পরিচয় ছিল রাজনৈতিক। আগামী দিনে সেটি ধর্মীয় হতে পারে।
তারপর অন্য কোনো পরিচয়ও আসতে পারে।
পরিচয় বদলাবে। স্লোগান বদলাবে। ব্যানার বদলাবে। কিন্তু যদি একই ক্ষমতাকাঠামো মানুষের অসহায়ত্ব, বেকারত্ব, ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক ক্ষোভকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে থাকে, তাহলে মূল সমস্যাটি থেকে যাবে একই জায়গায়।
লাঠিয়াল বদলাবে, লাঠির মালিক বদলাবে না।
তাই আজকের অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিত—
তৌহিদী জনতা কি সত্যিই ইসলামের আদর্শ থেকে জন্ম নেওয়া একটি স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক শক্তি, নাকি স্থানীয় ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তাদের একটি নতুন লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় স্লোগানে পাওয়া যাবে না।
উত্তর খুঁজতে হবে টাকা, যোগাযোগ, সংগঠক, স্বার্থ এবং সুবিধাভোগীর কাছে।
