Headlines

শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ সম্পদ সৃষ্টি, আত্মনির্ভরতা ও মানবিকতা

ফলোআপ নিউজ

জীবনের শিক্ষা কোথায়?

সার্টিফিকেট নয়, সম্পদ সৃষ্টি ও আত্মনির্ভরতা শেখানোর সময় এসেছে

ফলোআপ নিউজ
স্থানীয়ভাবে যত বেশী সমস্যার সমাধান করা যাবে জীবন তত সহজ এবং বাহুল্যতা মুৃক্ত হবে। জীবন সহজ এব্ং সুন্দর হবে। ভাবতে হবে, একটি গ্রাম কীভাবে এবং কতটা স্বনির্ভর হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে আমরা আসলে কী শিখি?

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা কী? কেউ বলবেন সুখ, কেউ বলবেন জ্ঞান, কেউ বলবেন পরিবার। কিন্তু বাস্তব জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষের প্রায় প্রতিটি সংগ্রামের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সারাজীবন যে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে, তা হলো পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব অথবা অর্জিত সম্পদ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারা। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, সন্তান প্রতিপালন কিংবা বার্ধক্যের নিরাপত্তা—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে সম্পদ। অথচ বিস্ময়করভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জীবনের এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।

একজন শিশু স্কুলে প্রবেশ করার পর থেকে বছরের পর বছর গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা, ইতিহাস, ভূগোল ও সাহিত্য শেখে। সে পরীক্ষা দেয়, নম্বরের জন্য প্রতিযোগিতা করে, সার্টিফিকেট অর্জন করে, তারপর আরও একটি সার্টিফিকেটের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তাকে খুব কমই শেখানো হয় কীভাবে সম্পদ সৃষ্টি করতে হয়, কীভাবে অর্থ পরিচালনা করতে হয়, কীভাবে পুঁজি গঠন করতে হয় কিংবা কীভাবে নিজের শ্রম, জ্ঞান ও দক্ষতাকে এমন কিছুতে রূপান্তর করা যায় যা তার নিজের জীবন, পরিবার এবং সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সৃষ্টি করবে।

আমাদের সমাজে শিক্ষার প্রচলিত ধারণাটিও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। শিক্ষা যেন এখন আর জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং একটি চাকরির প্রবেশপত্র অর্জনের মাধ্যম। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শুনে বড় হয়— ভালোভাবে পড়াশোনা করো, ভালো ফল করো, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হও, তারপর একটি ভালো চাকরি পাবে। পুরো ব্যবস্থাটি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে একজন তরুণ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত নিজেকে চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করতে থাকে। অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও সৃষ্টিশীল সময়ের একটি বড় অংশ সে অপেক্ষা করেই কাটিয়ে দেয়। অথচ সেই চাকরি আদৌ তার জন্য অপেক্ষা করছে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে— একজন মানুষ কি কেবল চাকরি করার জন্য জন্মায়? নাকি সে নিজেও সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে, অন্য মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, নিজের সমাজের সমস্যার সমাধান করতে পারে?

আজকের পৃথিবীতে কর্মমুখী হওয়া মানেই শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে কাজ করা বা ফ্রিল্যান্সিং করা নয়। বরং প্রকৃত শিক্ষা একজন তরুণকে এমনভাবে গড়ে তুলবে, যাতে সে নিজের বাড়ি, গ্রাম কিংবা মহল্লাকেই সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শেখে। সে বুঝতে শিখবে, তার আশপাশের মানুষের কী সমস্যা রয়েছে এবং সেই সমস্যার সমাধান করেই কীভাবে সম্পদ সৃষ্টি করা যায়।

কোথাও নিরাপদ খাদ্যের অভাব, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও কৃষিপণ্যের সঠিক বাজার নেই, কোথাও কারিগরি সেবার ঘাটতি, কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল, কোথাও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব। এসব সমস্যার প্রতিটিই আসলে একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ। একজন শিক্ষার্থী যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে কীভাবে একটি সমস্যা চিহ্নিত করতে হয়, কীভাবে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে স্বল্প পুঁজিতে উৎপাদন শুরু করতে হয়, কীভাবে সঞ্চয় গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে সমবায় বা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করতে হয় এবং কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, তাহলে সে শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করবে না; বরং আরও অনেক মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আনতে পারবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত এখানেই— এটি মানুষকে ভোক্তা হতে শেখায়, কিন্তু উৎপাদক হতে শেখায় না। একজন শিক্ষার্থী জানে কীভাবে চাকরির আবেদন করতে হয়, কিন্তু জানে না কীভাবে একটি ছোট কারখানা গড়ে তুলতে হয়। সে জানে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হয়, কিন্তু জানে না কীভাবে নিজের বাড়ির ছাদ, আঙিনা বা জমিকে উৎপাদনের সম্পদে পরিণত করতে হয়। সে জানে কীভাবে মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করতে হয়, কিন্তু জানে না কীভাবে নিজের এলাকার মানুষের জন্য একটি নতুন সেবা তৈরি করতে হয়।

অথচ পৃথিবীর প্রতিটি সমৃদ্ধ সমাজের ভিত্তি তৈরি হয়েছে হাজার হাজার ছোট উদ্যোগ, স্থানীয় উৎপাদন এবং সমস্যা সমাধানকারী মানুষের হাত ধরে। বড় শিল্পও একদিন ছোট উদ্যোগ হিসেবেই শুরু হয়েছিল।

আমি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কল্পনা করি, যেখানে ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণি থেকেই একজন শিক্ষার্থী শিখবে কীভাবে একটি পরিবার অর্থনৈতিকভাবে পরিচালিত হয়; কীভাবে সঞ্চয় করতে হয়; কীভাবে পুঁজি তৈরি হয়; কীভাবে একটি ছোট ব্যবসার হিসাব রাখতে হয়; কীভাবে কৃষি, প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা কিংবা সৃজনশীলতাকে সম্পদে রূপান্তর করা যায়; কীভাবে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন বুঝে একটি উদ্যোগ তৈরি করা যায়। তাকে শেখানো হবে, চাকরি পাওয়া জীবনের একমাত্র সাফল্য নয়; অন্যের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাও একটি মহান সাফল্য।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষা তাকে শেখাবে নিজের এলাকাকে ভালোবাসতে। নিজের গ্রামের সমস্যাগুলোকে চিনতে। কেন কৃষক ন্যায্য দাম পায় না, কেন বর্জ্য রিসাইক্লিং হয় না, কেন বিশুদ্ধ পানির সংকট, কেন তরুণরা বেকার —এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। কারণ যে তরুণ নিজের সমাজের সমস্যা বুঝতে শেখে, সেই তরুণই একদিন সেই সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হয়।

এর অর্থ এই নয় যে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন বা শিল্পকলার গুরুত্ব কমে যাবে। বরং এগুলোই মানুষকে মানবিক করে, চিন্তাশীল করে, নৈতিক করে তোলে। কিন্তু মানবিকতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাও একটি সভ্য সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি। শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে একই সঙ্গে সৎ, সংবেদনশীল, সৃজনশীল এবং আত্মনির্ভর করে তোলে।

আজ আমরা সার্টিফিকেটকে শিক্ষার সমার্থক বানিয়ে ফেলেছি। অথচ সার্টিফিকেট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি; এটি মানুষের সৃষ্টিশীলতা, দক্ষতা কিংবা সম্পদ সৃষ্টির ক্ষমতার প্রমাণ নয়। বাস্তব পৃথিবীতে একজন মানুষকে মূল্য দেওয়া হয় সে কতগুলো ডিগ্রি অর্জন করেছে তার জন্য নয়; বরং সে সমাজের জন্য কতটা মূল্য সৃষ্টি করতে পেরেছে তার জন্য।

সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার। এমন একটি শিক্ষা, যেখানে একজন কিশোর ১৫ বা ১৬ বছর বয়সেই বুঝতে শিখবে— সে শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, সে একজন সম্ভাব্য উদ্যোক্তা; সে শুধু একজন পরীক্ষার্থী নয়, সে একজন সমস্যা সমাধানকারী; সে শুধু একজন ভোক্তা নয়, সে একজন উৎপাদক; সে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, নিজের গ্রাম, নিজের শহর এবং নিজের দেশের ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে পারে।

কারণ একটি সার্টিফিকেট মানুষকে পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতা দিতে পারে না। স্বাধীনতা আসে তখনই, যখন একজন মানুষ নিজের জ্ঞান, দক্ষতা, শ্রম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের এবং সমাজের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে। যে শিক্ষা সেই সক্ষমতা তৈরি করে, সেটিই প্রকৃত শিক্ষা। আর যে শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট দেয়, কিন্তু মানুষকে জীবন গড়ার শক্তি দেয় না, সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় অনেক আগেই এসে গেছে।