Headlines

ভদ্রলোকের মুখোশের আড়ালে দুবৃত্ততন্ত্র

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিপজ্জনক সামাজিক জোট তৈরি হয়েছে— দুবৃত্ত ও ভদ্রলোকের জোট।

দুবৃত্তরা ক্ষমতা, প্রভাব ও অবৈধ অর্থের উৎস নিয়ন্ত্রণ করেছে; আর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ সেই ব্যবস্থার নৈতিক বৈধতা জুগিয়েছে। একজন ঘুষ নেয়, আরেকজন ফাইল ঠিক করে দেয়; একজন লুট করে, আরেকজন তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়; একজন জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়, আরেকজন টকশোতে বসে “বাস্তবতা” বোঝায়। এভাবেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের আধুনিক দুবৃত্ততন্ত্র।

এ অচলায়তন ভাঙতে হবে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই শ্রেণিটি নিজেকে কখনো অপরাধী হিসেবে দেখে না। তারা নিজেদের “শিক্ষিত”, “পেশাজীবী”, “মেধাবী” বা “রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি” বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— যে ব্যবস্থায় দুর্নীতি, দখল, লুটপাট ও বৈষম্য টিকে থাকে, সেখানে এই উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি কী ভূমিকা পালন করেছে? তারা কি প্রতিরোধ করেছে, নাকি সুবিধাভোগী অংশীদার হয়েছে?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন ক্রমশ বুঝতে শুরু করেছে যে, শুধু রাজনৈতিক দুবৃত্তরাই নয়, তাদের চারপাশে থাকা একদল শিক্ষিত সহযোগীও এই ব্যবস্থার অংশ। ব্যাংক লুটের নথি কে তৈরি করেছে? অবৈধ প্রকল্পের হিসাব কে সাজিয়েছে? কর ফাঁকির কৌশল কে বানিয়েছে? ভুয়া রিপোর্ট কে লিখেছে? জমি দখলের কাগজ কে বৈধ করেছে? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সর্বত্র একদল উচ্চশিক্ষিত “ভদ্রলোক” উপস্থিত।

এরা প্রকাশ্যে নীতিকথা বলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদর্শের বুলি আওড়ায়, গণতন্ত্র ও সুশাসনের কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে দুবৃত্তদের টেবিল থেকে পাওয়া অংশটুকু আঁকড়ে ধরে থাকে। জনগণের কাঁধে চেপে থাকা এই শ্রেণি নিজেদেরকে নিরপেক্ষ বলে দাবি করলেও তাদের আয়, সুযোগ, পদোন্নতি ও নিরাপত্তার বড় অংশ এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে আপস করে।

এ কারণেই আজ মানুষের ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নয়; ক্ষোভ সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিরুদ্ধেও, যারা বছরের পর বছর অন্যায়কে “স্বাভাবিক” বলে চালিয়ে দিয়েছে। তারা রাষ্ট্রকে ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড় করানোর বদলে নিজেদের সুবিধামতো বেঁকিয়ে নিয়েছে। ফলে সমাজে এক ধরনের নৈতিক দেউলিয়াত্ব তৈরি হয়েছে— যেখানে ডিগ্রি আছে, কিন্তু সাহস নেই; জ্ঞান আছে, কিন্তু বিবেক নেই; ভদ্রতার মুখোশ আছে, কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই।

এই বাস্তবতা এখন আর গোপন নেই। জনগণ বুঝে গেছে যে, দুবৃত্তদের শক্তি শুধু অস্ত্র বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে আসে না; আসে শিক্ষিত সহযোগীদের কলম, সিলমোহর ও নীরবতা থেকে। আর যখন কোনো সমাজে নীরবতা লাভজনক হয়ে ওঠে, তখন অন্যায়ই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের অলিখিত নীতি।

বাংলাদেশ আজ সেই সংকটের মুখোমুখি। প্রশ্ন এখন কেবল কে দুর্নীতিবাজ, তা নয়; প্রশ্ন হলো কে দুর্নীতির কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে? যে উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি নিজেদেরকে জাতির বিবেক বলে পরিচয় দেয়, তাদের আগে জবাব দিতে হবে তারা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, নাকি দুবৃত্তদের পাশে।

সময় এসেছে মুখোশ খোলার। কারণ, জনগণ আর শুধু লুটেরাদের দেখছে না; তারা এখন সেই ভদ্রলোকদেরও চিনে ফেলেছে, যারা লুটের টেবিলের পাশে বসে সভ্যতার ভাষায় অন্যায়কে বৈধতা দিয়েছে।