নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল এসেছে। দীর্ঘদিন পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের এই উদ্যোগে তাদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের বড় একটি অংশ এখনো এমন কোনো জাতীয় আয়-সমন্বয় কাঠামোর বাইরে, যেখানে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে নিয়মিতভাবে সমন্বয় করা হবে।
এখানেই সামনে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নিয়ে রাষ্ট্রের যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, দেশের বেসরকারি ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য তার সমতুল্য সুরক্ষা কোথায়?
সরকারি চাকরিজীবী ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। একই সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি দপ্তরে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য ছিল।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের আওতায় আসা সরকারি কর্মজীবীদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। এই জনগোষ্ঠীর বেতন কাঠামো নির্ধারণের জন্য রয়েছে জাতীয় পে কমিশন, সরকারি বাজেট, নির্দিষ্ট গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন ভাতার কাঠামো।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি জাতীয় বেতন কাঠামো নেই।
ফলে একই বাজারে কাজ করা দু’জন কর্মজীবীর একজনের আয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত ও পর্যায়ক্রমে সমন্বিত হওয়ার সুযোগ পান, অন্যজনের বেতন অনেকাংশে নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা ও ব্যক্তিগত দর-কষাকষির ওপর। আসলে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে দরকষাকষির কোনো সুযোগ আর থাকে না।
মূল্যস্ফীতি কমলেও দাম কমেনি
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বড় বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, জুনে যা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে মূল্যস্ফিতি আরো বেশী।
মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থ কিন্তু পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
ফলে একজন বেসরকারি কর্মীর বেতন যদি এক বছরেও উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে। খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা— প্রায় প্রতিটি খাতেই তাকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, যা একই মাসের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। অর্থাৎ গড় হিসাবে মজুরি বৃদ্ধিও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি। একইসাথে এই গড় হিসেবেও গড়মিল আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেসরকারি কর্মীর সমস্যা শুধু বেতন নয়
বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম, ছুটি ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তবতা আইনের কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
বাংলাদেশের শ্রম আইনে সাধারণ কর্মঘণ্টা দিনে ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সময় কাজের বিধান এবং ওভারটাইমের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অফিসভিত্তিক চাকরিতে ‘জরুরি কাজ’, ‘ডেডলাইন’ কিংবা ‘অফিসের প্রয়োজন’-এর নামে কর্মঘণ্টা দীর্ঘ হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
সমস্যা হলো— বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা ও শ্রমের প্রকৃত মূল্য সবসময় প্রতিফলিত হয় না।
একজন কর্মী ৮ ঘণ্টার বেতনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করলেও তার বাড়তি শ্রমের যথাযথ আর্থিক মূল্যায়ন হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি আছে, কিন্তু জাতীয় মজুরি কাঠামো নেই
শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খণ্ডিত। বিভিন্ন শিল্প ও খাতের জন্য আলাদা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। যেমন তৈরি পোশাক খাতে ২০২৩ সালের নতুন কাঠামোয় প্রবেশ পর্যায়ের শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৬ সালেও এই হারই কার্যকর রয়েছে বলে বিভিন্ন শ্রমবাজার তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— একটি পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন কয়েক বছর আগে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিক কতটা নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারেন?
এখানে Minimum Wage এবং Living Wage-এর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যূনতম মজুরি হলো আইনগতভাবে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মজুরি। আর Living Wage হলো এমন আয়, যা দিয়ে একজন কর্মী ও তার পরিবার মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে পারেন।
বাংলাদেশে শ্রম সংস্কার নিয়ে আলোচনাতেও একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব এসেছে। ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংস্কার নিয়েও এমন একটি জাতীয় মজুরি নির্ধারণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সরকারি বেতন বাড়লে বাজারে কী হবে?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং দীর্ঘ সময় বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। তাই বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতির প্রশ্নটি হলো— একটি বড় জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বাজারে কতটা পড়বে? শুধু বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার বিষয় নয়, বিষয়টি দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এখানে সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে পে-স্কেল হলেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে। মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে মুদ্রা সরবরাহ, চাহিদা, উৎপাদন, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি, খাদ্য সরবরাহসহ বহু বিষয়ের ওপর।
তবে সরকারি কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে তাদের অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা ভোগ ও চাহিদা বাড়াতে পারে। সরবরাহ যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে কিছু পণ্য ও সেবার দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি নিয়মের কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বাজার মূলত একটি দৃষ্টান্ত সামনে রেখে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। বাজারের জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আর সেই বাজারে সরকারি কর্মচারীর পাশাপাশি থাকবেন বেসরকারি কর্মী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও অনিয়মিত আয়ের মানুষ— যাদের আয় একই হারে বাড়ার নিশ্চয়তা নেই।
তাহলে বেসরকারি কর্মজীবীদের জন্য কী?
এখানেই রাষ্ট্রের নীতিগত দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য যেমন পে-স্কেল আছে, বেসরকারি কর্মীদের জন্য অন্তত একটি জাতীয় Salary/Wage Framework নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
এই কাঠামোয় থাকতে পারে—
১. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের নীতি
২. পদ ও দক্ষতাভিত্তিক ন্যূনতম বেতন কাঠামো
৩. নির্ধারিত কর্মঘণ্টার কঠোর বাস্তবায়ন
৪. অতিরিক্ত কাজের জন্য বাধ্যতামূলক ওভারটাইম
৫. সাপ্তাহিক ছুটি ও বার্ষিক ছুটির বাস্তব প্রয়োগ
৬. নির্দিষ্ট সময় পরপর বেতন পর্যালোচনা
৭. চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুরক্ষা
৮. খাতভিত্তিক নয়, দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় জাতীয় Living Wage কাঠামো।
প্রশ্নটা তাই পে-স্কেলের বিরোধিতা নয়
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে আপত্তি করার বিষয় নয়। রাষ্ট্রের কর্মচারীদেরও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু একই যুক্তি বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার ব্যবস্থা থাকবে, অথচ একই বাজারে থাকা একজন বেসরকারি কর্মীর বেতন বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকবে— এই ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে আয় বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
তাই এখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার সরকারি চাকরিজীবীর বেতন কাঠামো নিয়ে রাষ্ট্রের যতটা প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ, দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ও শ্রমজীবী মানুষের আয়, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে কি ততটাই ভাবনা আছে?
কারণ মূল্যস্ফীতি কাউকে সরকারি, বেসরকারি কিংবা শ্রমিক হিসেবে আলাদা করে দেখে না। বাজার সবার জন্য একই— তাহলে আয় সুরক্ষার কাঠামো এত আলাদা কেন?
