যে সমাজে মাদককে ঠেকানো কঠিন, দুর্নীতি থামানো কঠিন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মানুষ অসহায়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ— সেই সমাজে নৌকাবাইচ, গান, বাউল, মাজার বা বৈশাখই কেন নৈতিকতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে?

প্রশ্নটি নৌকাবাইচ নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আসলে নৈতিকতার অগ্রাধিকার নিয়ে।
একটি সমাজে কোন বিষয়কে আমরা ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করছি, সেটি অনেক কিছু বলে দেয়। মাদকাসক্ত তরুণের জীবন ধ্বংস হচ্ছে, মাদকের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ছে, ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া কঠিন, চাঁদাবাজির ভয়ে ব্যবসায়ী আতঙ্কিত, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা অনিশ্চিত— এসব বাস্তবতার মধ্যেও যদি কারও প্রধান উদ্বেগ হয়ে ওঠে কে গান গাইছে, কোথায় নৌকাবাইচ হচ্ছে, বাউলের আখড়ায় কী হচ্ছে, মাজারে মানুষ কেন যাচ্ছে কিংবা পহেলা বৈশাখে মানুষ কীভাবে উৎসব করছে— তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা আসলে কোন সমাজ তৈরি করতে চাই?
নৈতিকতার কাজ কি মানুষের জীবনকে নিরাপদ করা, নাকি মানুষের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা?
ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ অবশ্যই কোনো সংস্কৃতি বা অনুষ্ঠানের কিছু বিষয়ে আপত্তি জানাতে পারেন। সেটি তার ব্যক্তিগত মত। কিন্তু আপত্তি আর নিষেধাজ্ঞা এক জিনিস নয়। নিজের বিশ্বাস অনুসরণ করা আর অন্যের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও উৎসব নিয়ন্ত্রণ করা— এ দুটির মধ্যেও মৌলিক পার্থক্য আছে।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে একটি বিশেষ ধরনের নৈতিক পুলিশিং শুরু হয়। সেখানে মানুষের চরিত্র, পোশাক, গান, উৎসব, সংস্কৃতি কিংবা বিনোদনকে বিচার করার আগ্রহ দেখা যায়; কিন্তু একই তীব্রতায় ঘুষখোর, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, ধর্ষক কিংবা দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আগ্রহ দেখা যায় না।
তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— নৈতিকতার এই বাছাইটা কেন?
মাদক একজন তরুণের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে পারে। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে পচিয়ে দিতে পারে। চাঁদাবাজি একজন মানুষের ব্যবসা ও জীবিকা ধ্বংস করতে পারে। ধর্ষণ একজন মানুষের শরীর, মন ও জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। শিশুর ওপর নির্যাতন তার পুরো ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অন্যদিকে একটি নৌকাবাইচ, একটি বাউল গান কিংবা একটি বৈশাখী আয়োজন— কেউ পছন্দ না করতেই পারেন। কিন্তু এগুলোকে সমাজের প্রধান নৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দাঁড় করানোর আগে প্রশ্ন করা দরকার: ক্ষতি আসলে কীসে হয়?
এখানেই নৈতিকতার একটি মৌলিক পরীক্ষা আছে।
আপনি যদি সত্যিই সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করতে চান, তাহলে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির পাশে দাঁড়ান। মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ধর্ষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ঘুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়ান। সরকারি অর্থ লুটের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।
কারণ একজন ক্ষুধার্ত শিশুর কাছে আপনার সংস্কৃতির সংজ্ঞার চেয়ে তার নিরাপত্তা বেশি জরুরি। একজন মাদকাসক্ত পরিবারের কাছে একটি নৌকাবাইচের চেয়ে মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি। একজন ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া নাগরিকের কাছে কারও গান গাওয়া বা না গাওয়ার চেয়ে রাষ্ট্রীয় সেবা দুর্নীতিমুক্ত হওয়া বেশি জরুরি।
নৈতিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো— আপনি ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে কতটা দাঁড়াতে পারেন।
দুর্বল মানুষের পোশাক, গান, সংস্কৃতি কিংবা উৎসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অপরাধীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অনেক কঠিন।
তাই প্রশ্নটা আরও গভীর।
কখনো কখনো কি আমরা এমন এক ধরনের নৈতিকতা তৈরি করছি, যেখানে মানুষের ক্ষতি করার চেয়ে মানুষের স্বাধীনতা বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে?
যেখানে অপরাধীর চেয়ে শিল্পী সন্দেহজনক, মাদক ব্যবসায়ীর চেয়ে বাউল বিপজ্জনক, চাঁদাবাজের চেয়ে বৈশাখী মিছিল আপত্তিকর, আর দুর্নীতিবাজের চেয়ে নৌকাবাইচ বেশি ‘নৈতিক সমস্যা’?
যদি এমন হয়, তাহলে সেটি ধর্মীয় নৈতিকতা নয়; সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি।
আর এখানেই ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়টিকেও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তৌহিদে বিশ্বাসী হওয়া একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসের নামে কারও সংস্কৃতি বন্ধ করার দাবি, মানুষের জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কিংবা অন্যের ওপর নিজের নৈতিক বিধান চাপিয়ে দেওয়া একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণ।
সব তৌহিদী মানুষ যে একই রকম, এমন দাবি যেমন করা যায় না, তেমনি কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে বিচার করাও ন্যায়সংগত নয়।
কিন্তু যারা ধর্মের নাম ব্যবহার করে সমাজে নৈতিকতার পাহারাদার হতে চান, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখাই যায়—
আপনাদের নৈতিকতার তালিকায় মাদক ব্যবসায়ী কত নম্বরে?
চাঁদাবাজ কত নম্বরে?
ঘুষখোর কত নম্বরে?
ধর্ষক কত নম্বরে?
শিশু নির্যাতনকারী কত নম্বরে?
আর নৌকাবাইচ কত নম্বরে?
উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি সমাজ কী নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়, তা দিয়ে সেই সমাজের নৈতিকতার চরিত্র বোঝা যায়।
আমরা যদি সত্যিই একটি নৈতিক সমাজ চাই, তাহলে মানুষের আনন্দ কেড়ে নেওয়ার আগে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গান বন্ধ করার আগে মাদক বন্ধ করতে হবে। বাউলের আখড়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নৌকাবাইচ থামানোর আগে চাঁদাবাজির নৌকা ডুবাতে হবে। আর বৈশাখের উৎসবকে সন্দেহ করার আগে রাষ্ট্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির অন্ধকার দূর করতে হবে।
কারণ সমাজের সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকট মানুষের গান নয়— মানুষের ওপর অন্যায়।
আর যে নৈতিকতা অন্যায়কে পাশ কাটিয়ে মানুষের সংস্কৃতিকে শাসন করতে চায়, সেই নৈতিকতার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তোলা জরুরি।
