সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ বিতর্ক থেকে বড় প্রশ্ন— কোন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের দুবৃত্তরা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে যান?
রহিমা খাতুন
বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে? প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাত নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবে ভূমি সেবা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
একটি জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, পর্চা সংগ্রহ, জমি মাপজোক কিংবা মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা— সাধারণ মানুষের কাছে এসব সেবা অনেক সময় শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি অনিশ্চিত যাত্রা। যেখানে নিয়মের পাশাপাশি প্রভাব, পরিচয় এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ বারবার সামনে আসে।
ভূমি কেন দুর্নীতির বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে? কারণ এখানে একদিকে রয়েছে বিপুল আর্থিক মূল্য, অন্যদিকে রয়েছে জটিল আইন ও রেকর্ড ব্যবস্থাপনা। একটি জমির কাগজ পরিবর্তন, একটি রেকর্ড সংশোধন বা একটি সিদ্ধান্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোটি টাকার সম্পদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। ফলে এই খাতকে ঘিরে তৈরি হয় নানা ধরনের স্বার্থের সংঘাত।
বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসনে ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা এবং মন্ত্রণালয় পর্যন্ত একটি বিশাল কাঠামো রয়েছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি), তহশিল অফিস, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী—সবাই এই ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু যখন কোনো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি, জবাবদিহি ও নাগরিকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে, তখন সেখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনীতি ও ব্যবসার সম্পর্ক। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, বড় ব্যবসায়ী পরিবার, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে এবং সম্পদ আবার রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে সাম্প্রতিক সম্পদ বিতর্ক এই পুরোনো প্রশ্নটিকে আবার সামনে এনেছে— কীভাবে এমন একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছান এবং একই সময়ে তার বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়?
তার বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল সম্পদের অভিযোগ উঠেছে এবং বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। দুদক তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়। কিন্তু এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণ হতে ডিজিটাল দুনিয়ায় আর বাকী কিছু নেই। এই ঘটনা একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যাকে সামনে এনেছে— রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা কেন অনেক সময় ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি আগে শনাক্ত করতে পারে না?
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এটি শুধু ঘুষ নেওয়া বা দেওয়া নয়; এটি একটি নেটওয়ার্ক। যেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তা, দালাল, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সুবিধাভোগীরা একটি অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি সেবায় এই সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার কারণ হলো সাধারণ মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না। ফলে তারা মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর এই সুযোগেই তৈরি হয় দালালনির্ভর একটি ব্যবস্থা।
ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু হওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু শুধু সফটওয়্যার তৈরি করলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না। প্রয়োজন তথ্যের উন্মুক্ততা, কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এবং নাগরিকের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— কেন একটি রাষ্ট্রে সৎ ও দক্ষ মানুষের চেয়ে অর্থ, প্রভাব ও রাজনৈতিক সংযোগ অনেক সময় বেশি কার্যকর পুঁজি হয়ে ওঠে?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি বা কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সম্পদ, সিদ্ধান্ত এবং স্বার্থের ওপর স্বাধীন নজরদারি থাকবে।
কারণ দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি তৈরি হয় না শুধু ব্যক্তিগত লোভ থেকে; অনেক সময় একটি দুর্বল ব্যবস্থাই তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়।
আর সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যায় ভূমি সেবার মতো খাতে— যেখানে সাধারণ মানুষের জমি, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ সরাসরি নির্ভর করে রাষ্ট্রের সততার ওপর।
