Headlines

নেত্রকোনার DNA রিপোর্ট প্রকাশ এবং রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের সময়গত নৈকট্য কি নিছক কাকতালীয়?

নেত্রকোনা

রংপুরের চার খুনের তীব্র আলোচনার মধ্যেই নেত্রকোনার মাদ্রাসাশিক্ষকের DNA ফল প্রকাশ—রাষ্ট্র কি জনআলোচনার গতিপথ বদলাতে চেয়েছে, নাকি দুটো ঘটনাই নিছক সময়ের কাকতাল?

নেত্রকোনা
অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমানউল্লাহ মাহমুদী সাগর—নেত্রকোনার মদনে মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণ মামলার সেই অভিযুক্ত, যার বিরুদ্ধে পরবর্তী DNA পরীক্ষায় নবজাতকের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে CID।

নেত্রকোনার মদনে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণটি প্রকাশ্যে এসেছে ২৫ আগস্ট। নবজাতকের DNA-এর সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের DNA-এর মিল পাওয়া গেছে বলে পুলিশ ও একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই মিল ৯৯.৯৯৯ শতাংশ পর্যন্ত বলা হয়েছে।

ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু একটি ধর্ষণ মামলার কারণে নয়। এর আগে অভিযুক্ত শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে তীব্র আলোচনা হয়েছিল। ফলে DNA রিপোর্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্কের বৈজ্ঞানিক নিষ্পত্তি সামনে এলো।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়।

নেত্রকোণায় শিশু ধর্ষণ
ডাক্তার সায়মা আক্তার। নেত্রকোনার সেই ১১ বছরের শিশুটিকে ধর্ষণের পর প্রেগন্যান্ট হওয়ার ঘটনাটি তিনিই সবার আগে ফেসবুকে সবাইকে জানান৷ বাচ্চাটা উনাকে সব বলার পর চুপ থাকতে পারেন নাই৷ এমনকি তিনি শিশুটির আল্ট্রাসাউন্ডের ছবিও প্রকাশ করেছিলেন। এর পরেই তার উপরে শুরু হয় মানসিক টর্চার৷

এই রিপোর্টটি ঠিক এই সময়েই কেন প্রকাশ্যে এলো?

কারণ একই সময়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রংপুরের একই পরিবারের চারজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

একই সময়ে দুইটি বড় ঘটনা

রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে ২২ আগস্টের দিকে। পুলিশ দ্রুত দুই তরুণ— মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশ দাবি করে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।

২২–২৩ আগস্টের মধ্যে পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন, হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা এবং গ্রেপ্তার দুই তরুণকে ঘিরে নানা প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর ২৪ আগস্ট দুই আসামির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির খবর আসে।

আর ঠিক তার পরের দিন, ২৫ আগস্ট, নেত্রকোনার সেই বহুল আলোচিত মামলার DNA ফল প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ সময়ের হিসাবটি দাঁড়াচ্ছে—

২০/২১ আগস্ট — রংপুরে হত্যাকাণ্ড

২২–২৩ আগস্ট — পুলিশি তদন্ত, গ্রেপ্তার ও সংবাদ সম্মেলন

২৪ আগস্ট —  আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির খবর

২৫ আগস্ট —  নেত্রকোনার DNA রিপোর্ট প্রকাশ

এই ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

রাষ্ট্র কি একটি আলোচনাকে অন্য আলোচনায় ঢেকে দিতে পারে?

একটি রাষ্ট্র বা প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট সংবাদকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে অন্য একটি সংবাদকে সামনে আনছে— এমন অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে শুধু সময়ের মিল যথেষ্ট নয়।

প্রমাণ করতে হবে অন্তত তিনটি বিষয়।

প্রথমত, DNA রিপোর্টটি আসলে কবে প্রস্তুত হয়েছিল?

রিপোর্ট ২৫ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে মানেই রিপোর্ট ২৫ আগস্ট প্রস্তুত হয়েছে— এমন নয়। ফরেনসিক রিপোর্ট তার আগেই তদন্তকারী সংস্থা বা পুলিশের হাতে এসে থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রিপোর্টটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত কবে নেওয়া হয়েছিল?

যদি দেখা যায়, DNA রিপোর্ট ২০ বা ২১ আগস্টের আগেই প্রস্তুত ছিল কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি, এবং রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ সেটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে— তাহলে সময়ের প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, প্রকাশের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল এবং কেন?

তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশ, CID, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার মধ্যে এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ, বৈঠক বা নির্দেশ ছিল কি না— সেটিই হবে আসল অনুসন্ধানের বিষয়।

আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন

নেত্রকোনার ঘটনাটি ছিল এমন একটি মামলা, যেখানে অভিযুক্তের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত তৈরির অভিযোগ উঠেছিল। DNA রিপোর্ট সেই বয়ানের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সামনে এনেছে।

অন্যদিকে রংপুরের ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত দ্রুত একটি নির্দিষ্ট মোটিভ সামনে এনেছে— ইয়াবা সেবন এবং বাধা দেওয়ার কারণে হত্যা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও চিকিৎসকের বক্তব্যে অমিলের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে দুই ঘটনাতেই একটি সাধারণ প্রশ্ন সামনে আসে:

রাষ্ট্র যে বয়ান সামনে আনছে, সেটি কি স্বাধীন প্রমাণ দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে?

নেত্রকোনায় DNA সেই যাচাইয়ের একটি শক্তিশালী উদাহরণ। রংপুরে এখন প্রয়োজন একই ধরনের স্বাধীন ফরেনসিক যাচাই।

তাহলে কি ‘অঘোষিত যুদ্ধ’?

এ পর্যায়ে সরাসরি বলা যাবে না যে রাষ্ট্রের কোনো অংশের সঙ্গে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক শক্তির ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ চলছে। আরও বেশি সতর্ক থাকা দরকার এই দাবির ক্ষেত্রেও যে রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে।

এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কিন্তু অনুসন্ধানের প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়।

কারণ প্রশ্নটি হচ্ছে—

একটি বহুল আলোচিত মামলায় অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে DNA প্রমাণ প্রকাশ্যে এলো ঠিক এমন সময়ে, যখন রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বয়ান নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা চলছে— এই দুই ঘটনার সময়গত সম্পর্ক কি নিছক কাকতাল?

উত্তর পেতে যে নথিগুলো দরকার

এই প্রশ্নের উত্তর অনুমান থেকে নয়, নথি থেকেই বের করতে হবে।

১. নেত্রকোনার DNA পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের তারিখ
২. ফরেনসিক ল্যাবে নমুনা পৌঁছানোর তারিখ
৩. চূড়ান্ত DNA রিপোর্ট তৈরির তারিখ
৪. রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে পৌঁছানোর তারিখ
৫. রিপোর্ট প্রকাশের সিদ্ধান্তের তারিখ
৬. ২০–২৫ আগস্টের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পুলিশ/CID কর্মকর্তাদের বৈঠক বা যোগাযোগের তথ্য
৭. রংপুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রথম পাওয়া ফরেনসিক প্রমাণ
৮. পুলিশ কমিশনারের প্রথম বয়ান এবং পরবর্তী ১৬৪ ধারার জবানবন্দির সময় ও বক্তব্যের তুলনা
৯. রংপুরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশি বয়ান পরিবর্তিত হয়েছে কি না
১০. দুই ঘটনার বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা প্রশাসনিক ব্যক্তির প্রকাশ্য বা গোপন হস্তক্ষেপের প্রমাণ আছে কি না;

এই মুহূর্তে সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হলো—দুটি ঘটনাকে এক করে ফেলা নয়, বরং তাদের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের chronology পরীক্ষা করা।

যদি দেখা যায় DNA রিপোর্ট আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, কিন্তু রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ সেটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— তাহলে প্রশ্ন উঠবেঃ

রাষ্ট্র কি একটি সংকটের মধ্যে আরেকটি বহুল আলোচিত সত্য সামনে এনে জনআলোচনার গতিপথ বদলাতে চেয়েছিল?

আর যদি নথি প্রমাণ করে যে DNA রিপোর্টের প্রকাশের প্রক্রিয়া রংপুরের হত্যাকাণ্ডের অনেক আগেই নির্ধারিত ছিল, তাহলে ‘সময়গত যোগসূত্র’-এর তত্ত্ব দুর্বল হয়ে যাবে।

সুতরাং এখন সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানী প্রশ্ন কোনো ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্ত নয়—

“DNA রিপোর্টটি আসলে কবে সরকারের হাতে এসেছিল?”

এই একটি তারিখই হয়তো পুরো গল্পের অনেকটা খুলে দিতে পারে।