নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অধীন কাস্টমস বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাঞ্চন রাণী দত্ত। সরকারি নথিতে তার নামে পাসপোর্টের অনাপত্তিপত্র বা NOC দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও গত এক দশকে তার বিদেশ সফরের সরকারি আদেশ (GO) কোথায়— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাঞ্চন রাণী দত্ত বর্তমানে কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও প্রকাশ্য সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে গত ১০ বছরে তার বিদেশ সফরের কোনো সুস্পষ্ট GO সহজে পাওয়া যাচ্ছে না
তবে বিষয়টি আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে তার পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সরকারি নথি।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই কাঞ্চন রাণী দত্তের নামে পাসপোর্টের অনাপত্তিপত্র (NOC) দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি উপ-কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এরপর ২০২৬ সালের ৮ মার্চ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর ওয়েবসাইটেও তার নামে “পাসপোর্টের অনাপত্তি প্রসঙ্গে” একটি নথি প্রকাশ করা হয়েছে। ওই নথিতে তাকে যুগ্ম কমিশনার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ অন্তত দুই সময়ে তার পাসপোর্ট-সংক্রান্ত সরকারি অনুমোদনের নথি প্রকাশ্যে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই NOC-গুলোর পর তিনি বিদেশে গিয়েছেন কি না?
যদি গিয়ে থাকেন, তাহলে সেই সফরের অনুমোদন কোথায়?
আর যদি গত ১০ বছরে তিনি একবারও বিদেশে না গিয়ে থাকেন, তাহলে পাসপোর্ট নবায়ন বা সংশ্লিষ্ট কাজে NOC নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কী ছিল— সেটিও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অবশ্য পাসপোর্টের NOC পাওয়া বিদেশ ভ্রমণের প্রমাণ নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়নের জন্য NOC নিতে পারেন, কিন্তু পরে বিদেশে নাও যেতে পারেন। ফলে এখানে মূল বিষয় হলো NOC নয়; বরং NOC-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরবর্তী বিদেশ ভ্রমণের প্রশাসনিক রেকর্ড রয়েছে কি না।
GO কোথায়?
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সাধারণত সফরের অনুমোদন, ছুটি, সফরের উদ্দেশ্য, সময়কাল এবং অর্থায়নের ধরনসংক্রান্ত প্রশাসনিক নথি তৈরি হয়। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটেও বিদেশ ভ্রমণের GO এবং পাসপোর্ট NOC আলাদা নথি হিসেবে প্রকাশের নজির রয়েছে।
ফলে কাঞ্চন রাণী দত্তের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি সুনির্দিষ্ট—
২০২২ সালে পাসপোর্টের NOC পাওয়ার পর তিনি কি বিদেশে গিয়েছেন?
২০২৬ সালে পাসপোর্টের NOC পাওয়ার আগে বা পরে কোনো বিদেশ সফর করেছেন কি না?
গত ১০ বছরে তার নামে কোনো সরকারি বিদেশ সফরের GO জারি হয়েছিল কি না?
যদি হয়ে থাকে, সেই GO-এর নম্বর, তারিখ, সফরের দেশ, উদ্দেশ্য এবং ব্যয়ভার কোথা থেকে এসেছে— এসব তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আর যদি NBR-এর রেকর্ড অনুযায়ী গত ১০ বছরে তার কোনো বিদেশ সফরই না হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও পরিষ্কারভাবে জানানো যেতে পারে। কারণ একজন উচ্চপদস্থ কাস্টমস কর্মকর্তার দীর্ঘ সময়ের বিদেশ সফর-সংক্রান্ত প্রশাসনিক রেকর্ড না থাকা এবং একই সময়ে পাসপোর্টের NOC পাওয়ার বিষয়টি জনস্বার্থে যাচাই করার মতো তথ্য।
এ বিষয়ে NBR-এর কাছে জানতে চায় ফলোআপ নিউজ—
- ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কাঞ্চন রাণী দত্ত কতবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন?
- তার নামে কোনো বিদেশ ভ্রমণের GO জারি হয়েছে কি না?
- হয়ে থাকলে প্রতিটি GO-এর নম্বর ও তারিখ কী?
- কোন কোন দেশে তিনি গেছেন?
- সফরগুলো সরকারি নাকি ব্যক্তিগত?
- সরকারি সফর হলে ব্যয়ভার কে বহন করেছে?
- ব্যক্তিগত সফর হলে সংশ্লিষ্ট বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আদেশ কোথায়?
- ২০২২ ও ২০২৬ সালের পাসপোর্ট NOC-এর পর তিনি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কি না?
এই তথ্যগুলো পাওয়া গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হবে— উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নথি কতটা স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা হয়।
কাঞ্চন রাণী দত্তের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি সরাসরি অভিযোগের নয়; বরং রেকর্ডের:
পাসপোর্টের NOC আছে— কিন্তু বিদেশ সফরের GO কোথায়? আর গত ১০ বছরে তিনি আদৌ বিদেশে গিয়েছেন কি না, তার সরকারি রেকর্ড কোথায়?
