নথিতে পুরোনো অনিয়মের ছাপ, দায় বর্তমান সিএসডি ম্যানেজারের কতটুকু?
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
খুলনা কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার— সিএসডি। রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ এই গুদামটি শুধু চাল-গম সংরক্ষণের জায়গা নয়; বিপুল পরিমাণ সরকারি খাদ্যশস্যের গ্রহণ, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, মজুদ ও বিতরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা সিএসডির মোট জমি ৫৫ দশমিক ৫৭ একর। এখানে মোট ৭৯টি গুদামের মধ্যে ৬৩টি কার্যকর এবং এর সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৯৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন।
এত বড় একটি সরকারি খাদ্যভাণ্ডারকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে ওঠা অভিযোগ, পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন, প্রশাসনিক নথি ও খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় সামনে আসে— সমস্যাটি কোনো একজন বর্তমান ম্যানেজারকে ঘিরে তৈরি হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা, মজুদ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যশস্যের মান যাচাই, গ্রহণ-বিতরণ এবং তদারকির বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন জমেছে।
ফলে বর্তমান সিএসডি ম্যানেজার এম এম ইকবাল হোসেনের ওপর অতীতের সব অনিয়মের দায় চাপানো কতটা যৌক্তিক— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ভালো চাল বদলে নিম্নমানের চাল রাখার অভিযোগ
খুলনা সিএসডি নিয়ে অতীতের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো গুদামে ভালো চালের পরিবর্তে নিম্নমানের চাল রাখার অভিযোগ।
প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনা সিএসডি থেকে পাচার হয়ে যাওয়া একটি ট্রাক র্যাব-৬ আটক করে। ওই ট্রাকে ২৭৫ বস্তায় ১৩ হাজার ৬৯০ কেজি চাল ছিল। একই প্রতিবেদনে গুদামের ভালো চাল পরিবর্তন করে নিম্নমানের চাল রাখার অভিযোগের কথাও উঠে আসে।
অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন শুধু চাল বাইরে যাওয়ার নয়— গুদামের অভ্যন্তরীণ মজুদ হিসাব, স্টক রেজিস্টার, গুদামভিত্তিক চালের মান, ইস্যু-রিসিভ রেকর্ড এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ম্যানেজার বদলালেও অভিযোগের ধরন কেন বদলায় না?
২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে তৎকালীন খুলনা সিএসডি ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করা, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা চাল-গম গ্রহণের ক্ষেত্রে অনৈতিক অর্থ আদায় এবং খাদ্যশস্যের গুণগতমান নিশ্চিত করতে উদাসীন থাকার অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
এগুলো অভিযোগ— প্রমাণিত অপরাধ নয়। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি একাধিক সময়পর্বে উঠে থাকে, তাহলে তদন্তের প্রশ্নটি কোনো একজন ম্যানেজারের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দিকে নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে এম এম ইকবাল হোসেন ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকলেও তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ের অনিয়মের দায় স্বাভাবিকভাবেই আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে তার দায়িত্বকালে নতুন কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটিও নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
সহকারী ব্যবস্থাপককে ঘিরে বদলির দাবি
সিএসডির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা সহকারী ব্যবস্থাপক পূর্ণিমা রাণী মণ্ডলকে বদলি করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন। তাদের দাবি, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পর্যায়ক্রমে বদলি করা হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারে।
তবে এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও মতামত। পূর্ণিমা রাণী মণ্ডলের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে— এমন দাবি এই প্রতিবেদনে করা হচ্ছে না। তার দায়িত্বকাল, দায়িত্বের পরিধি, পূর্বের বদলি ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করেই বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
বরং এখানেই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— সিএসডিতে কোন কর্মকর্তা কত বছর ধরে কোন দায়িত্বে আছেন এবং একই দায়িত্বে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে কোনো প্রশাসনিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কি না।
পুরোনো ম্যানেজমেন্ট নিয়েও দুদকের মামলা
খুলনা সিএসডির অতীত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গুরুতর তথ্য পাওয়া যায় দুদকের মামলায়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ মঈন উল ইসলাম ২০১৭ সালের দিকে খুলনা সিএসডির সহকারী ব্যবস্থাপক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক মামলা করে।
অর্থাৎ সিএসডির ব্যবস্থাপনা পর্যায়কে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ একেবারে নতুন কোনো ঘটনা নয়।
শুধু চাল নয়, বস্তা কেনাকাটাতেও প্রশ্ন
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খুলনা খাদ্য বিভাগের বস্তা কেনাকাটা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই লাখ নতুন বস্তা কেনার পর তেরোখাদা গুদামে পাঠানো ২০ হাজার বস্তার মধ্যে ৮ হাজার পুরোনো বস্তা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সরবরাহকারীকে জানিয়ে বস্তাগুলো পরিবর্তন করা হয়।
এখানেও অনুসন্ধানের প্রশ্ন হচ্ছে— দরপত্রে নতুন বস্তার শর্ত থাকার পর সরবরাহ পর্যায়ে পুরোনো বস্তা কীভাবে ঢুকল? গ্রহণ কমিটি কী পরীক্ষা করেছিল? কোন পর্যায়ে ত্রুটি ধরা পড়ল? এবং এর আগে কতগুলো বস্তা একইভাবে গ্রহণ করা হয়েছে?
সিএসডির বিশাল মজুদের হিসাব কতটা স্বচ্ছ?
খুলনা সিএসডির বিপুল ধারণক্ষমতার কারণে এখানকার প্রতিটি মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি গুদামের ক্ষেত্রে যাচাই করা প্রয়োজন—
প্রাপ্তি → মান পরীক্ষা → গুদামে প্রবেশ → স্টক রেজিস্টার → গুদাম থেকে উত্তোলন → পরিবহন → গন্তব্যে গ্রহণ → অবশিষ্ট মজুদ।
এই পুরো চেইনের যেকোনো একটি জায়গায় হিসাবের গরমিল থাকলে সরকারি খাদ্যশস্যের অপচয়, আত্মসাৎ বা মান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান ম্যানেজারের দায়ই কি সবচেয়ে বেশি?
খুলনা সিএসডিকে ঘিরে প্রকাশ্য তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আপাতত এটিই— এখানে অভিযোগের ইতিহাস বর্তমান ব্যবস্থাপকের সময়ের অনেক আগের।
অতীতে ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘিরে দুদকের মামলা হয়েছে, চালের মান পরিবর্তন ও খাদ্যশস্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে, বস্তা কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ এসেছে এবং খাদ্যশস্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
তাই বর্তমান ম্যানেজার এম এম ইকবাল হোসেনকে অতীতের সব অনিয়মের জন্য দায়ী করার আগে তার দায়িত্বকাল পৃথকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একইভাবে বর্তমান সময়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নথির ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
যে নথিগুলোতে মিলতে পারে দুর্নীতির আসল চিত্র
খুলনা সিএসডির গত ১০ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে—
১. গুদামভিত্তিক চাল-গমের Opening Stock ও Closing Stock
২. মাসভিত্তিক খাদ্যশস্য গ্রহণ ও বিতরণ হিসাব
৩. চালের মান পরীক্ষার রিপোর্ট
৪. গুদামভিত্তিক স্টক রেজিস্টার
৫. চাল-গম পরিবহনের চালান ও ট্রানজিট রেকর্ড
৬. বস্তা ক্রয়ের দরপত্র, কার্যাদেশ ও সরবরাহ বিল
৭. বস্তা গ্রহণের কমিটির রিপোর্ট
৮. শ্রমিক মজুরি ও শ্রমিক নিয়োগের রেকর্ড
৯. গুদাম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিল
১০. নিরাপত্তা ও পাহারাদার সংক্রান্ত ব্যয়
১১. পূর্বের অডিট আপত্তি ও নিষ্পত্তির নথি
১২. গুদামভিত্তিক খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়ার হিসাব
১৩. দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার ও সহকারী ম্যানেজারদের দায়িত্বকাল
১৪. পূর্বের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
১৫. অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থা।
এসব নথি একসঙ্গে বসিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে— কোন অনিয়ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কোনটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং কোনটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি ব্যবস্থার অংশ।
সামনে বড় অনুসন্ধান
খুলনা সিএসডির অনিয়মের প্রকৃত চিত্র জানতে হলে শুধু বর্তমান ম্যানেজারের কক্ষ বা বর্তমান দায়িত্বশীলদের দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে গত এক দশকের পুরো প্রশাসনিক ও আর্থিক চেইন।
কার আমলে কত খাদ্যশস্য এসেছে, কত বের হয়েছে, কত নষ্ট হয়েছে, কত ঘাটতি হয়েছে, কোন কর্মকর্তা তখন দায়িত্বে ছিলেন, কোন অডিট আপত্তি উঠেছিল এবং তার কী নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব তথ্য পাশাপাশি বসালেই বেরিয়ে আসতে পারে সিএসডির অনিয়মের প্রকৃত চিত্র।
অতএব প্রশ্নটি শুধু “বর্তমান ম্যানেজার কী করেছেন?” —এমন নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, “খুলনা কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামে বছরের পর বছর ধরে যে অভিযোগ ও অনিয়মের স্তর জমেছে, তার দায় কোন সময়ে, কোন কর্মকর্তা এবং কোন ব্যবস্থাপনা কাঠামোর?”
এই প্রশ্নের উত্তর নথিতেই রয়েছে।
