Headlines

একটি ডিমের জন্য মৃত্যুঃ লোভ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের আয়নায় দেখা দারিদ্র্যের মুখ

ডিম কুড়াতে গিয়ে মৃত্যু

ফরিদপুরে একটি ডিমবোঝাই ট্রাক উল্টে যায়। ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার ডিম। আশপাশের মানুষ সেই ডিম কুড়াতে ছুটে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটি যানবাহনের চাপায় পাঁচজন মানুষের মৃত্যু হয়। সংবাদটি পড়ে অনেকেই হয়তো বলবেন— “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।” কিন্তু সত্যিই কি এটি লোভের গল্প?

বরং এটি এমন একটি সমাজের গল্প, যেখানে একটি ডিমও অনেক মানুষের কাছে বিলাসিতা। এটি এমন এক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে একজন মানুষের সারাদিনের পরিশ্রমের পরও ঘরে পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছায় না। যেখানে একটি ডিম মানে শিশুর জন্য একবেলার পুষ্টি, বৃদ্ধ মায়ের জন্য একটু শক্তি, কিংবা নিজের ক্ষুধা মেটানোর একটি ছোট্ট সুযোগ।

দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়। প্রতিদিন পাঁচ টাকা, দশ টাকা কিংবা একবেলার খাবারের হিসাব করতে করতে মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলে যায়। তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আত্মসম্মান কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বড় হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদরা একে “Scarcity Mindset” বা অভাবের মনস্তত্ত্ব বলেন। অভাব মানুষের চিন্তার পরিধিকে সংকুচিত করে ফেলে। তখন ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানের ক্ষুধা বেশি বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা প্রায়ই দেখি, কোথাও ট্রাক থেকে চাল পড়ে গেলে মানুষ দৌড়ে যায়, কোথাও তেল পড়ে গেলে বোতল নিয়ে ছুটে আসে, কোথাও ফল বা সবজি ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে ভিড় জমে যায়। এগুলো কি সবই লোভ? নাকি এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নীরব সাক্ষ্য?

যে মানুষটির মাস শেষে সংসার চালাতে ধার করতে হয়, যার সন্তানের মুখে সপ্তাহে একদিনও ডিম ওঠে না, যার ঘরে দুধ কেনা উৎসবের মতো ঘটনা—  তার কাছে রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটি ডিমের মূল্য আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি। আমরা যেটিকে তুচ্ছ ভাবি, সেটিই তার কাছে প্রয়োজন।

দারিদ্র্যের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে মানুষের সম্ভাবনাকে গ্রাস করে। একজন শিশুর মেধা, একজন তরুণের স্বপ্ন, একজন শ্রমিকের আত্মবিশ্বাস— সবকিছু ক্রমে ক্ষয়ে যেতে থাকে। প্রতিদিনের সংগ্রাম তাকে এমন এক জীবনে ঠেলে দেয়, যেখানে বেঁচে থাকাই একমাত্র লক্ষ্য। মানুষ তখন আর নিজের প্রতিভা, শিক্ষা বা যোগ্যতা নিয়ে ভাবতে পারে না; ভাবতে হয় পরবর্তী খাবারটি কোথা থেকে আসবে।

দীর্ঘদিন এই বাস্তবতায় বসবাস করলে মানুষ তার অস্তিত্বের বড় অংশ হারিয়ে ফেলে। সে আর সমাজের সক্রিয় নাগরিক থাকে না; টিকে থাকার লড়াইয়ে আটকে পড়ে। বাইরে থেকে অনেকেই এই দৃশ্যকে “হুড়োহুড়ি” বা “অসভ্যতা” বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, চরম অভাব মানুষের আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই এমন ঘটনাকে শুধু ব্যক্তির চরিত্র দিয়ে বিচার করলে বাস্তব সমস্যাটি আড়াল হয়ে যায়।

অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, খাদ্য সহায়তা, বেকার ভাতা, স্কুলের পুষ্টিকর খাবার কিংবা জরুরি সহায়তা মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ফলে রাস্তায় পড়ে থাকা কয়েকটি ডিম কুড়ানোর জন্য জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার প্রয়োজন হয় না। কারণ তারা জানে, আগামীকাল তাদের পরিবারের খাবার সম্পূর্ণ অনিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশকে আমরা সম্ভাবনার দেশ বলি। উর্বর মাটি, বিস্তীর্ণ নদী, কৃষি উৎপাদন, বিপুল জনশক্তি— সবই আমাদের রয়েছে। তারপরও কেন একটি ডিমের জন্য মানুষ জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে? প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি ন্যায্য বণ্টন, কর্মসংস্থান, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।

আমরা যখন উন্নয়নের বড় বড় সূচক নিয়ে গর্ব করি, তখন আমাদের দেখতে হবে সেই উন্নয়নের ফল কার ঘরে পৌঁছাচ্ছে। যদি একটি দেশের মানুষ এখনও রাস্তার ওপর পড়ে থাকা খাবারের জন্য ছুটতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের পরিসংখ্যান অসম্পূর্ণ। কারণ উন্নয়ন কেবল সেতু, উড়ালপুল বা জিডিপির বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন একজন মানুষ তার পরিবারের জন্য একটি ডিম কিনতে গিয়ে অপমানিত হয় না, কিংবা একটি ডিম কুড়াতে গিয়ে প্রাণ হারায় না।

ফরিদপুরের সেই পাঁচজন মানুষের মৃত্যু তাই কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা এক নির্মম প্রশ্নপত্র। আমরা কি তাদের “লোভী” বলেই দায় শেষ করব, নাকি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে একটি ডিম আর কখনও মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠবে না?