Headlines

“দুই টাকার সাংবাদিক” নাকি নীরব বিপ্লবের কণ্ঠস্বর?

সরকারি অফিসগুলোতে এখন একটি বাক্য খুব পরিচিত— “মুর্খ সাংবাদিকদের অত্যাচারে কাজ করা যায় না।” এই অভিযোগে বিরক্তি আছে, ক্ষোভ আছে, কখনো কখনো ভয়ের আভাসও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি একজন ক্ষমতাহীন, অর্থহীন, প্রভাবহীন সাংবাদিক একজন ক্ষমতাবান সরকারি কর্মকর্তাকে ‘অত্যাচার’ করতে পারে?

যদি পারে, তবে দুর্বলতা কোথায়?

একজন সরকারি কর্মকর্তার হাতে থাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, আইনি সুরক্ষা, গাড়ি, দপ্তর, জনবল, বাজেট, এমনকি কখনো কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণও। অন্যদিকে একজন স্থানীয় সাংবাদিক, ইউটিউবার বা ফেসবুকভিত্তিক সংবাদকর্মীর হাতে থাকে একটি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কিছু প্রশ্ন করার সাহস। এই অসম লড়াইয়ে ভয় পাওয়ার কথা কার?

আসলে ভয়টা সাংবাদিককে নয়, ভয়টা দৃশ্যমানতাকে

অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হওয়ার ভয়

বাংলাদেশের বহু সরকারি অফিস দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অচলায়তনের মধ্যে চলেছে। সাধারণ মানুষ সেখানে ঢোকে ভয় নিয়ে, কথা বলে সংকোচ নিয়ে, আর তথ্য চায় অনিশ্চয়তা নিয়ে। ফাইল কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে, কার স্বাক্ষর লাগবে, কেন ঘুরতে হচ্ছে— এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় নিয়মের বইয়ে নয়, বরং অদৃশ্য এক সংস্কৃতির মধ্যে লুকানো থাকে।

ডিজিটাল মাধ্যম সেই অদৃশ্যতাকে ভেঙে দিয়েছে।

আজ একজন সাধারণ নাগরিক একটি ভিডিও ধারণ করতে পারে, একটি পোস্ট লিখতে পারে, একটি লাইভ করতে পারে। সে হয়তো দুর্নীতির জটিল অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করতে পারবে না, কিন্তু সে বুঝতে পারে— “এখানে কিছু একটা ঠিক নেই।” এই পর্যবেক্ষণক্ষমতাকেই অনেক সময় অবমূল্যায়ন করা হয়।

জ্ঞান বনাম বোধ

সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই জ্ঞানকে ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ করি। কিন্তু প্রশাসনের বাস্তবতা বুঝতে সব সময় পিএইচডি লাগে না। একজন চা-দোকানদার জানেন কোন অফিসে কাজ দ্রুত হয়, কোন অফিসে হয় না। একজন দালাল জানে কোথায় ফাইল আটকে থাকে। একজন ভুক্তভোগী নাগরিক জানেন তাকে কতবার ঘুরতে হয়েছে। আর একজন মাঠঘাটে ঘোরা সাংবাদিক জানেন— কোন দরজার সামনে মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে।

এটি হয়তো একাডেমিক জ্ঞান নয়, কিন্তু এটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার জ্ঞান

কেন ক্ষোভ বাড়ছে?

অনেক সরকারি কর্মকর্তা মনে করেন, ডিজিটাল সাংবাদিকতা মানহীন হয়ে গেছে। সত্যিই এই অভিযোগ পুরোপুরি অমূলক নয়। অনলাইন মাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভিউ-নির্ভর উসকানিমূলক কনটেন্ট— এসব বাস্তব সমস্যা। কিন্তু এই বাস্তব সমস্যাকে সামনে এনে সব সাংবাদিককে “মুর্খ” বলা যেমন অন্যায়, তেমনি সব কর্মকর্তাকে দুর্নীতিবাজ বলাও অন্যায়।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোঃ কেন এত ছোট ছোট প্ল্যাটফর্মও এখন প্রভাব ফেলতে পারছে?

কারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়েছে। যখন নাগরিক মনে করে তার অভিযোগ শোনা হয় না, তখন সে ক্যামেরার সামনে কথা বলে। যখন মনে করে ফাইলের ভেতরে সত্য চাপা পড়ে যায়, তখন সে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। এই প্রবণতা কেবল সাংবাদিকতার পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

দুর্বলতা আসলে কোথায়?

দুর্বলতা সাংবাদিকের শক্তিতে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার ঘাটতিতে।

যে অফিসে তথ্য উন্মুক্ত, সিদ্ধান্ত লিখিত, প্রক্রিয়া ডিজিটাল, জবাবদিহি কার্যকর— সেখানে সাংবাদিকের প্রশ্ন ভয় তৈরি করে না। বরং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু যেখানে নিয়ম ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব বড়, সেখানে একটি মোবাইল ক্যামেরাও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নীরব বিপ্লব

আজ গ্রামের একজন তরুণ ইউটিউব চ্যানেল খুলে ইউনিয়ন অফিসের সমস্যা তুলে ধরছে। শহরের একজন নারী ফেসবুক লাইভে হাসপাতালের দুর্ভোগ দেখাচ্ছেন। একজন ক্ষুদ্র অনলাইন সাংবাদিক কাস্টমস, ভ্যাট, ভূমি অফিস বা পৌরসভার অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এদের সবাই পেশাদার সাংবাদিক নাও হতে পারেন, কিন্তু তারা একটি বড় পরিবর্তনের অংশ— তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ

এটি নিখুঁত বিপ্লব নয়। এতে বিশৃঙ্খলা আছে, অপব্যবহার আছে, অপরিপক্বতা আছে। কিন্তু এটিকে কেবল “মুর্খদের অত্যাচার” বলে উড়িয়ে দিলে বাস্তবতা বোঝা হবে না।

রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় সমালোচনা দমন করে নয়, সমালোচনার জবাব দিয়ে। সাংবাদিক শক্তিশালী হয় গালি দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে। আর নাগরিক শক্তিশালী হয় ভয় কাটিয়ে প্রশ্ন করতে শেখার মাধ্যমে।

আজকের সংঘাত আসলে “মুর্খ সাংবাদিক বনাম জ্ঞানী কর্মকর্তা”র লড়াই নয়। এটি পুরোনো অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো এবং নতুন দৃশ্যমান নাগরিক সমাজের সংঘর্ষ।

মোবাইল ফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তথাকথিত “দুই টাকার সাংবাদিক” হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞান জানেন না, অর্থনীতি জানেন না, প্রশাসনিক আইনও জানেন না। কিন্তু তিনি একটি বিষয় বুঝে গেছেন— সরকারি অফিস জনগণের, এবং প্রশ্ন করার অধিকারও জনগণের।

আর ইতিহাস বলে, অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয় খুব ছোট, খুব অবহেলিত, খুব সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকে।