উচ্চপদস্থ রাজস্ব কর্মকর্তাদের ছুটির নথিতে নতুন করে প্রশ্ন — শ্রান্তি বিনোদন আর বহিঃবাংলাদেশ ছুটির সীমারেখা কোথায়?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ওয়েবসাইটে নিয়মিতভাবে কর্মকর্তাদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির অফিস আদেশ প্রকাশিত হচ্ছে। একই ওয়েবসাইটে আবার আলাদাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’র আদেশ। ফলে উচ্চপদস্থ কাস্টমস ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোন ছুটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে একই সময়ে কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার ও মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির একাধিক আদেশ প্রকাশ পাওয়ায় বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
নাহিদা ফরিদীর ছুটির আদেশ
সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে রয়েছে ড. নাহিদা ফরিদী, কমিশনার-এর শ্রান্তি বিনোদন ছুটির অফিস আদেশ। NBR-এর তথ্য অনুযায়ী, আদেশটি প্রকাশ করা হয়েছে ১১ আগস্ট ২০২৬। একই তালিকায় তার আগে ও পরে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আদেশও রয়েছে।
তবে শুধু শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আদেশ প্রকাশিত হয়েছে বলেই ওই কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং অনুসন্ধানের প্রশ্ন হচ্ছে, এই ছুটির সঙ্গে কোনো বিদেশ ভ্রমণ যুক্ত ছিল কি না এবং থাকলে ভ্রমণের জন্য আলাদা বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বা অন্য কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।

একই তালিকায় কমিশনার থেকে অতিরিক্ত কমিশনার
২০২৬ সালের NBR-এর শ্রান্তি বিনোদন ছুটির তালিকা দেখলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
১৫ এপ্রিল মোঃ আবদুল হাকিম, কমিশনার, ২০ এপ্রিল মীর আবু আবদুল্লাহ আল সাদাত, অতিরিক্ত কমিশনার, ৭ মে মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার, ২০ জুলাই রাফিয়া সুলতানা, অতিরিক্ত কমিশনার, ২১ জুলাই ফাহাদ আল ইসলাম, যুগ্ম কমিশনার এবং ১২ আগস্ট রুকবা ইফফাত, যুগ্ম কমিশনার-এর শ্রান্তি বিনোদন ছুটির অফিস আদেশ প্রকাশ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৬ সালের মার্চে মোঃ আবদুল মান্নান সরদার, কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) এবং এইচ এম শরিফুল হাসান, অতিরিক্ত কমিশনার-এর শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আদেশও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; NBR-এর প্রকাশিত নথিতে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির ধারাবাহিকতা রয়েছে।
২৪ আগস্টেও মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত কমিশনার
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ২৪ আগস্টের প্রকাশিত আদেশগুলো দেখলে। ওই দিন NBR-এর সর্বশেষ আপডেটে মোঃ ফজলুল হক, মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব)-এর শ্রান্তি বিনোদন ছুটির অফিস আদেশ প্রকাশিত হয়েছে। একই দিনে মোঃ দেলোয়ার হোসেন এবং মোঃ শাকিল খন্দকার, দুজন অতিরিক্ত কমিশনারের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আদেশও প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে একই দিনের তালিকায় একজন কাস্টমস কর্মকর্তার Ex-Bangladesh Leave-এর আদেশও রয়েছে। অর্থাৎ NBR-এর প্রশাসনিক নথিতেই একই সময়ে ‘শ্রান্তি বিনোদন ছুটি’ এবং ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’— দুই ধরনের ছুটির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।

তাহলে প্রশ্নটা কোথায়?
সরকারি চাকরিতে শ্রান্তি বিনোদন ছুটি বৈধ ছুটি। কাজেই কোনো কর্মকর্তা এই ছুটি নিয়েছেন— এটি নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়।
শ্রান্তি বিনোদন ছুটিতে থাকা একজন কর্মকর্তা যদি বিদেশে যান, তাহলে তার বিদেশযাত্রার প্রশাসনিক অনুমোদন কীভাবে হচ্ছে?
তিনি কি একই সঙ্গে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির অনুমোদন নিচ্ছেন?
নাকি শ্রান্তি বিনোদন ছুটিই বিদেশ ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে?
যদি বিদেশ ভ্রমণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ছুটির আবেদনে গন্তব্য দেশ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও সময়কাল কী ছিল?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সঙ্গে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে কেউ যদি ব্যক্তিগত বিদেশ সফর করেন, সেটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?

‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’ যখন আলাদা ব্যবস্থাই আছে
NBR-এর ওয়েবসাইটে ‘Rest & Recreation Leave’ এবং ‘Ex-Bangladesh Leave’ আলাদা বিভাগ হিসেবে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো যে রয়েছে, তা NBR-এর নিজস্ব তথ্যভান্ডারেই স্পষ্ট।
২০২৬ সালেও কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তার বহিঃবাংলাদেশ ছুটির নথি পাওয়া যাচ্ছে। NBR-এর Ex-Bangladesh Leave তালিকায় মোঃ আবদুল মান্নান সরদার, কমিশনার (চলতি দায়িত্ব)-এর বহিঃবাংলাদেশ ছুটির একটি আদেশ ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।
এমনকি বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আদেশে সাধারণত বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্তও থাকে। একটি ২০২৫ সালের NBR আদেশে ব্যক্তিগত উৎস থেকে ভ্রমণ ব্যয় বহনের শর্ত এবং ব্যবহৃত পাসপোর্টের উল্লেখ রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— যেখানে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’র আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে শ্রান্তি বিনোদন ছুটিতে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রার প্রশাসনিক হিসাবটি কী?
পাসপোর্ট, ছুটি ও ইমিগ্রেশন— তিন নথি মিললেই বের হবে সত্য
NBR-এর ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের পাসপোর্টের অনাপত্তিপত্রও প্রকাশিত হয়। সেখানে কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, সদস্য, মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত নথি রয়েছে।
ফলে বিষয়টি যাচাই করা কঠিন নয়।
২০২৫–২৬ সালে উচ্চপদস্থ কাস্টমস কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে—
শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আদেশ + বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আদেশ + পাসপোর্ট/NOC + ইমিগ্রেশন যাত্রার তথ্য
এই চারটি তথ্য পাশাপাশি মিলিয়ে দেখা হলেই বোঝা সম্ভব কোন কর্মকর্তা কখন বিদেশ গেছেন এবং কোন ছুটির ভিত্তিতে গেছেন।
প্রশ্নের উত্তর নথিতেই
এখন পর্যন্ত NBR-এর প্রকাশ্য নথি থেকে যা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা হলো—উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির একাধিক আদেশ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এবং একই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পৃথকভাবে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
কিন্তু শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বিদেশ ভ্রমণের ‘আড়াল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না— তার উত্তর পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রার প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে ছুটির নথি মিলিয়ে দেখা জরুরি।
সেখানেই ফলোআপ নিউজ-এর এই রিপোর্টের অনুসন্ধানের মূল জায়গা।
শ্রান্তি বিনোদন— দেশে বিশ্রাম, নাকি বিদেশে বিনোদন?
