গুলশান-ধানমন্ডির ব্যাংক, করপোরেট অফিসসহ হাজারো প্রতিষ্ঠানের ভাড়ায় প্রযোজ্য ভ্যাট আদায় হচ্ছে কি?

ঢাকার একটি ছোট দোকান। মাসে বিক্রি হয় সামান্য কিছু টাকা। সংসারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া, চিকিৎসা— সব খরচ সামলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই যার জন্য কঠিন। অথচ ভ্যাট ব্যবস্থার নিয়মের মধ্যে পড়লে তাকে ভ্যাট দিতে হচ্ছে, হিসাব রাখতে হচ্ছে, রিটার্ন দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে একই শহরের গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল কিংবা উত্তরা এলাকায় লাখ লাখ টাকা মাসিক ভাড়ায় চলছে ব্যাংকের শাখা, বীমা কোম্পানি, এনজিও, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
প্রশ্ন হলো— এসব অফিস যে জায়গা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছে, সেই ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট কি নিয়মিত সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) বিধানে ‘স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণকারী’ সেবার ক্ষেত্রে ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধের বিধান রয়েছে। বিধানটিতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের শাখা বা বিক্রয়কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত ইউনিটের মাধ্যমে ভ্যাট জমা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ একটি ব্যাংক বা বড় প্রতিষ্ঠানের শাখা যদি ভাড়া করা জায়গায় পরিচালিত হয়, সেই ভাড়ার ভ্যাটের হিসাব কেন্দ্রীয় ভ্যাট ব্যবস্থায় থাকার কথা।
কিন্তু বাস্তবে কতটি প্রতিষ্ঠান তা করছে— এই তথ্যই এখন বড় প্রশ্ন।
গুলশানে ব্যাংকের শাখা, এনজিও, অফিস— ভাড়ার হিসাব কোথায়?
গুলশান-১ ও গুলশান-২ ঢাকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর অন্যতম। এখানে ব্যাংকের শাখা, এনজিও ও করপোরেট অফিসের সংখ্যা কম নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নথিতে গুলশানে Standard Chartered-এর Gulshan Branch, Citibank-এর Head Office, State Bank of India-এর Dhaka Branch, Bank Alfalah-এর Gulshan Branch, NBP-এর Gulshan Branch সহ একাধিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পাওয়া যায়।
এ ছাড়া গুলশানে রয়েছে Dhaka Bank Limited || Gulshan Branch, Prime Bank Gulshan Branch, IFIC Bank PLC | Gulshan Branch, Eastern Bank PLC. এবং Bengal Commercial Bank PLC-এর মতো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান।
Dhaka Bank-এর নিজস্ব প্রকাশিত শাখা তালিকাতেও Gulshan Branch, Gulshan Circle-2 Branch এবং Gulshan Corporate Branch-এর তথ্য রয়েছে।
এসব শাখার কোনোটি ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—
মাসে যদি এক-দুই-পাঁচ লাখ টাকা বা তারও বেশি ভাড়া দেওয়া হয়, সেই ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট কত?
কে সেই ভ্যাট দিচ্ছে?
কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট সমন্বয় করছে কি না?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
ভ্যাট বিভাগগুলোর কাছে এসব ভাড়া লেনদেনের হিসাব আছে কি?
প্রশ্ন আছে এনজিওগুলো নিয়ে। হেড অফিস সহ সারাদেশে তাদের অসংখ্য শাখা অফিস রয়েছে।
ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও আশপাশে অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি দৃশ্যমান উদাহরণঃ
ActionAid Bangladesh, Hope Foundation, Save the Children in Bangladesh, Oxfam in Bangladesh Country Office, Habitat for Humanity Bangladesh, iDE Bangladesh, PHD-Partners in Health & Development, SNV Netherlands Development Organisation, Acted Bangladesh, BURO Bangladesh, Manusher Jonno Foundation, Hope Foundation, NRT (Network for Research & Training), NRT
Concerned Women for Family Development (CWFD)
এরকম হাজারো প্রতিষ্ঠান কি তাদের অফিস ভাড়ার ওপর যথাযথভাবে ভ্যাট প্রদান করছে?
এক লাখ টাকা ভাড়া হলে বছরে ভ্যাট কত?
একটি সাধারণ হিসাব করা যাক।
ধরা যাক, একটি অফিস মাসে ১ লাখ টাকা ভাড়া দেয়।
বার্ষিক ভাড়া = ১২ লাখ টাকা।
১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসাবে সম্ভাব্য ভ্যাট = ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বছরে।
মাসিক ভাড়া ২ লাখ হলে বছরে সম্ভাব্য ভ্যাট = ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
মাসিক ভাড়া ৫ লাখ হলে বছরে সম্ভাব্য ভ্যাট = ৯ লাখ টাকা।
এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত হিসাব নয়; প্রযোজ্য ভ্যাট ১৫ শতাংশ এবং ভ্যাটটি ভাড়ার অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য— এমন সরল হিসাবের উদাহরণ।
কিন্তু ঢাকার একটি বড় ভবনে যদি ১০টি অফিস থাকে এবং প্রত্যেকে গড়ে ২ লাখ টাকা ভাড়া দেয়, তাহলে বছরে মোট ভাড়া ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ১৫ শতাংশ হিসাবে সম্ভাব্য ভ্যাটের অঙ্ক ৩৬ লাখ টাকা।
এমন ভবন যদি শত শত হয়?
তাহলে প্রশ্নটি আর ছোটখাটো রাজস্বের নয়।
ছোট দোকানদার বনাম বড় অফিস
ঢাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একজন মুদি দোকানি, কাপড়ের দোকানি, ছোট রেস্টুরেন্ট মালিক, মোবাইল ব্যবসায়ী কিংবা ছোট সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যবসার মূলধন সীমিত।
তার আয় থেকে খাবার কিনতে হয়, বাসাভাড়া দিতে হয়, সন্তানকে পড়াতে হয়, কর্মচারীর বেতন দিতে হয়।
তারপরও ব্যবসা ভ্যাটের আওতায় পড়লে তাকে ভ্যাট ব্যবস্থার নিয়ম মানতে হয়।
অন্যদিকে একটি করপোরেট অফিস মাসে কয়েক লাখ টাকা শুধু অফিস স্পেসের ভাড়া বাবদ পরিশোধ করতে পারে।
এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বছরে কয়েক লাখ টাকার ভ্যাট হয়তো ব্যবসার তুলনায় খুব বড় অঙ্ক নয়।
তবু যদি সেই ভ্যাট যথাযথভাবে আদায় না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—
রাজস্ব প্রশাসনের নজরদারি কি ভুল জায়গায় বেশি?
ধানমন্ডিতেও একই প্রশ্ন
ধানমন্ডি এখন শুধু আবাসিক এলাকা নয়। এখানে ব্যাংক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, রেস্টুরেন্ট, করপোরেট অফিস ও বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য অফিস রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নথিতে HSBC-এর Dhanmondi Branch-এর ঠিকানাও রয়েছে—Bay’s Park Heights, Road 09, Dhanmondi।
একটি ব্যাংক শাখা যে ধরনের জায়গায় পরিচালিত হয়, সেটি সাধারণ ছোট দোকানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। জায়গার আয়তন, অবস্থান, অবকাঠামো এবং ভাড়ার পরিমাণ— সবই আলাদা।
তাই প্রশ্নও আলাদা হওয়া উচিতঃ
ধানমন্ডির প্রতিটি ভাড়া নেওয়া ব্যাংক শাখা ও করপোরেট অফিসের ভাড়া চুক্তি কি ভ্যাট কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজে রয়েছে?
চুক্তিতে উল্লেখিত ভাড়া ও প্রকৃত পরিশোধিত ভাড়া কি মিলিয়ে দেখা হয়?
ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ভ্যাট রিটার্নে শাখাগুলোর ভাড়ার ভ্যাট কীভাবে প্রতিফলিত হয়?
ব্যাংক কি ভাড়া বাবদ ভ্যাট দেয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের শাখা ভাড়া করা জায়গায় পরিচালিত হলেই ব্যাংক ভ্যাট দিচ্ছে না— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।
বরং অনুসন্ধানের বিষয় হলো— ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান প্রযোজ্য ভ্যাট যথাযথভাবে হিসাব করে জমা দিচ্ছে কি না।
NBR-এর বিধানেই কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের শাখা বা বিক্রয়কেন্দ্রের স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে কেন্দ্রীয়ভাবে ভ্যাট জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তাই ভ্যাট বিভাগের কাছে খুব সহজেই প্রশ্ন করা যায়—
ঢাকার ব্যাংক শাখাগুলোর ভাড়ার বিপরীতে গত পাঁচ বছরে কত টাকা ভ্যাট জমা হয়েছে?
এই একটি তথ্যই অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
বছরে কয়েক লাখ টাকার ভ্যাট— কোথায় যাচ্ছে?
ধরা যাক, কোনো বড় অফিসের মাসিক ভাড়া ৩ লাখ টাকা।
বার্ষিক ভাড়া ৩৬ লাখ টাকা।
১৫ শতাংশ হিসাবে সম্ভাব্য ভ্যাট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ একটি অফিস থেকেই বছরে কয়েক লাখ টাকা ভ্যাটের প্রশ্ন আসে।
এমন ১০টি অফিস হলে সম্ভাব্য অঙ্ক ৫৪ লাখ টাকা।
১০০টি অফিস হলে ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
আর ঢাকার গুলশান, বনানী, মতিঝিল, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর ও অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকায় এমন অফিসের সংখ্যা হাজার হাজার।
তাই অফিস ভাড়া খাতকে ভ্যাট প্রশাসনের জন্য বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে দেখা উচিত কি না— সেটিই এখন প্রশ্ন।
অথচ ছোট ব্যবসায়ীর ওপর নিয়মের চাপ
রাজস্ব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ন্যায্যভাবে কর আরোপ করা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র যদি এমন হয়—
একজন স্বল্প আয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার সীমিত আয়ের ওপর ভ্যাটের চাপ বহন করছেন;
আর একই শহরে একটি বড় প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে অফিস চালাচ্ছে, কিন্তু সেই ভাড়ার প্রযোজ্য ভ্যাট যথাযথভাবে পরিশোধ হচ্ছে কি না তা যাচাই করার দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই—
তাহলে সেটি শুধু রাজস্বের সমস্যা নয়।
এটি কর-ন্যায্যতার প্রশ্ন।
চার ভ্যাট কমিশনারেটের কাছে ১০টি প্রশ্ন
ফলোআপ নিউজ বিশেষ করে জানতে চাওয়া যেতে পারে—
১. গত পাঁচ অর্থবছরে ‘স্থান ও স্থাপনা ভাড়া’ খাত থেকে বিভাগভিত্তিক কত টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে?
২. ব্যাংক শাখাগুলোর ভাড়ার বিপরীতে কত টাকা ভ্যাট জমা হয়েছে?
৩. ভাড়া নেওয়া করপোরেট অফিসগুলোর ক্ষেত্রে কত টাকা ভ্যাট জমা হয়েছে?
৪. কতটি ভাড়া চুক্তি ভ্যাট কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছে?
৫. কতটি ক্ষেত্রে ঘোষিত ভাড়া ও প্রকৃত ভাড়ার মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে?
৬. কত টাকা ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত হয়েছে?
৭. কত টাকা আদায় করা হয়েছে?
৮. কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শাখাগুলোর ভাড়া-ভ্যাট কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়?
৯. ২০২৬ সালের নতুন ব্যবস্থার পর এ-চালান/ই-পেমেন্টের মাধ্যমে ভাড়া-সংক্রান্ত কত টাকা ভ্যাট জমা পড়েছে?
১০. অফিস ভাড়া খাতে ভ্যাট ফাঁকি রোধে কোনো বিশেষ অডিট বা অভিযান হয়েছে কি না?
রাজস্বের প্রশ্নে ছোট-বড় সবার জন্য একই নিয়ম চাই
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ভ্যাটের আওতায় আনা প্রয়োজন হলে তাকে নিয়ম মানতেই হবে।
কিন্তু একই নিয়ম বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, করপোরেট অফিস ও বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হতে হবে।
কারণ একজন ছোট ব্যবসায়ী যদি তার সীমিত আয়ের ওপর কয়েক হাজার টাকা ভ্যাট দেন, আর একটি বড় অফিস যদি লাখ লাখ টাকার ভাড়া পরিশোধ করেও সেই ভাড়ার প্রযোজ্য ভ্যাট যথাযথভাবে না দেয়— তাহলে রাজস্ব ব্যবস্থার ন্যায়সংগত চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
প্রশ্নটি তাই কোনো একটি ব্যাংক, কোনো একটি অফিস কিংবা কোনো একটি বাড়ির মালিককে ঘিরে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়—
ঢাকার হাজার হাজার অফিস যে ভাড়া দিচ্ছে, সেই ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাটের কতটা সরকার পাচ্ছে?
আর যদি উত্তর হয়— প্রাপ্য ভ্যাটের একটি বড় অংশই আদায় হচ্ছে না, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন আরও কঠিনঃ
