Headlines

নির্বাক // দিব্যেন্দু দ্বীপ

নির্বাক
নাহার একজন অটিস্টিক শিশুর মা। পাশে দাঁড়ানোর মতো তেমন কেউ নেই। ঢাকার একটি বস্তিঘেষা নতুন  এলাকায় দুই রুমের ছোট্ট একটি বাসায় সে থাকে তার এগারো বছরের ছেলে ঈশপকে নিয়ে।

ঈশপের অটিজমের পাশাপাশি সম্প্রতি ধরা পড়েছে ডিএমডি নামে একটি কঠিন রোগ। ডাক্তার বলেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। শ্বাস নিতেও সমস্যা হতে পারে। তাই ঘরে আলো-বাতাসের প্রবাহ খুব জরুরি।

কিন্তু নাহারের জীবনে আরেকটি সমস্যা এসে জুটেছে।

একটি রাস্তার বিড়াল।

তাড়ালে যায়, আবার ফিরে আসে। ঝাড়ু হাতে দৌড়ালে গেটের বাইরে সরে দাঁড়ায়, কিছুক্ষণ পর আবার দরজার সামনে এসে বসে থাকে। যেন ওর কোনো কাজ আছে এই বাসায়।

অবশেষে বিরক্ত হয়ে নাহার জানালা-দরজা বন্ধ রাখা শুরু করে। কাজটা সহজ ছিলো না। পুরোনো ঝং ধরা জানালাগুলোতে একেকটায় ছয়টি করে ছোট ছোট কপাট। একসঙ্গে খোলা বা বন্ধ করার উপায় নেই। একটি একটি করে খুলতে হয়, একটি একটি করে বন্ধ করতে হয়। চাইলেই মুহূর্তে বন্ধ করা আবার ইচ্ছে হলে খোলা সম্ভব নয়।

গরমে হাঁসফাঁস লাগে, তবু সে বন্ধ রাখে।

কিন্তু দরজা খুলতেই বিড়ালটি ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

নাহার ভেবেছিলো, এবার নিশ্চয়ই রান্নাঘরে যাবে, মাছের কাঁটা খুঁজবে, কিছু একটা ওলোটপালোট করবে। কিন্তু না। বিড়ালটি কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চলে যায় শোবার ঘরে। তারপর খাটের নিচে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

অনেকক্ষণ পর বেরিয়ে এসে খাবার পেলে খায়, আবার খাটের নিচে।

এমন ঘটনা একদিন নয়, প্রায় প্রতিদিনই ঘটতে লাগলো।

ধীরে ধীরে নাহারের বিরক্তি কমতে শুরু করে। নিশ্চয়ই প্রাণীটা তাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছে। পৃথিবীতে এত ঘরবাড়ি থাকতে কেন সে বারবার এই বাসাতেই আসে?

নাহার জানালাগুলো সব খুলে দেয়। ঘরে রোদ ঢুকলো, বাতাস ঢুকলো। ঈশপের মুখেও যেন একটু স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো।

সেদিন সে বিড়ালটিকে ভালো করে খেতে দেয়।

বিড়ালটি খাবার শেষ করেই ব্যস্তভাবে আবার খাটের নিচে ঢুকে পড়ে।

নাহার হেসে ভাবে, “কী অদ্ভুত প্রাণী! না কোনো উৎপাত করে, না আদর চায়। শুধু খায় আর খাটের নিচে গিয়ে বসে থাকে।”

এরপর কেটে গেল আরও কিছুদিন।

এক সন্ধ্যায় আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে আসে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই নাহার তাড়াহুড়ো করে সব জানালা বন্ধ করে দেয়।তারপর দরজাটাও ভালো করে আটকে দেয়।

সেদিন বিড়ালটি বাইরে ছিলো।

রাত গভীর হয়। ঝড়ের শব্দে ঘর কাঁপতে থাকে। জানালার কপাটগুলো কাঁপতে কাঁপতে শব্দ করছে।

হঠাৎ শেষরাতের দিকে নাহারের ঘুম ভেঙে যায়।

কেউ যেন কাঁদছে।

প্রথমে মনে হলো, বাতাসের শব্দ।

তারপর আবার শুনতে পায়।

দরজার ওপাশে বসে বিড়ালটি কাঁদছে। দীর্ঘ, আকুল, অসহায় এক ডাক।

নাহার বিছানায় উঠে বসে।

ঠিক তখনই আরেকটি শব্দ তার কানে আসে।

খুব মিহি, খুব ক্ষীণ।

খাটের নিচ থেকে।

যেন কয়েকটি ছোট্ট গলা একসঙ্গে ডাকছে।

নাহারের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে

সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

ভেজা শরীর নিয়ে বিড়ালটি ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢোকে। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চলে যায় খাটের নিচে।

এই ঘর, এই খাটের নিচে, এই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যই এতদিন ধরে বিড়ালটি বারবার ফিরে এসেছে।

খাটের একপাশে ঈশপ ঘুমিয়ে আছে। এগারো বছরের ছেলেটি। সেও তো কথা বলতে পারে না। নিজের কষ্ট, ভয়, প্রয়োজন—কিছুই ভাষায় বলতে পারে না।

নাহার ছেলের মুখের দিকে তাকায়।

তারপর খাটের নিচের অন্ধকারের দিকে।

বাইরে তখনও ঝড় চলছে।

পৃথিবীর সব মায়ের ভাষা এক নয়, কেউ মানুষের ভাষায় ডাকে, কেউ গভীর রাতে দরজার ওপাশে বসে কাঁদে।

পৃথিবীতে সব শিশু বড় হয় না, তাড়া খেয়েও সব মা তাই পালাতে পারে না।