প্রথমে ডাকাতির সম্ভাবনা, পরে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার গল্প— হত্যার সময়, ঘটনাস্থলের আলামত, চারটি ফোন, লুটপাটের চিহ্ন ও কথিত হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়ে পুলিশের দাবিগুলো কতটা ফরেনসিক প্রমাণে সমর্থিত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কি কোনো সংবাদমাধ্যম?
নিজস্ব অনুসন্ধান | FollowUpNews
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ১২ বছরের ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যার ঘটনায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশের তদন্তের বয়ানে বড় পরিবর্তন এসেছে।

লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে থাকা রংপুর সিআইডির কর্মকর্তার বক্তব্য ছিলো— বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার জায়গা ভাঙা এবং ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো। প্রাথমিকভাবে তাই ঘটনাটি ডাকাতি বলে মনে হচ্ছিল। এমনকি হত্যাকাণ্ডটি তিন-চার দিন আগে ঘটেছে বলেও ধারণা দেওয়া হয়েছিলো।
কিন্তু ২৩ আগস্ট দুপুরে পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানাল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কাহিনি। পুলিশের দাবি, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই মামাতো ভাই বৃহস্পতিবার রাতে পাশের ভবন হয়ে ওই বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠলে তাঁদের দেখে ফেলেন। এরপর তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। একে একে স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়— পুলিশের ভাষ্য এমনই।
এরপর দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম মূলত পুলিশের এই বয়ানটিই প্রকাশ করেছে।
কিন্তু এখানেই তো সাংবাদিকতার কাজ শেষ হওয়ার কথা নয়— বরং শুরু হওয়ার কথা।

প্রথম প্রশ্ন: ডাকাতি থেকে ইয়াবা— এত দ্রুত গল্প বদলাল কীভাবে?
ঘটনার প্রথম পর্যায়ে তদন্তকারীরা কেন ডাকাতির সম্ভাবনা দেখেছিলেন?
বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন ছিলো?
টাকা-পয়সা বা স্বর্ণালংকার রাখার জায়গা কেন ভাঙা পাওয়া গেল?
ঘরের জিনিসপত্র কেন তছনছ ছিলো?
এসব কি নিছক হত্যাকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা? নাকি সত্যিই লুটপাট হয়েছিলো?
প্রথম পর্যায়ের তদন্তে যেসব আলামত দেখে ডাকাতির সন্দেহ তৈরি হয়েছিলো, পরবর্তী তদন্তে সেগুলোর ব্যাখ্যা কী দেওয়া হয়েছে— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে স্পষ্ট নয়।
স্বজনদের একজন আবার বলেছেন, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা নিয়ে বিরোধ হয়েছিলো এবং তার সন্দেহ ঘটনাটিকে অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হতে পারে। এটি স্বজনের বক্তব্য— প্রমাণিত তথ্য নয়। কিন্তু একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাজ হলো এই বক্তব্যটি যাচাই করা, শুধু উদ্ধৃত করে ছেড়ে দেওয়া নয়।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: হত্যাকাণ্ডের সময় নিয়ে কি পরিষ্কার তথ্য আছে?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য রয়েছে।
লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিলো, হত্যাকাণ্ডটি তিন-চার দিন আগে ঘটেছে।
অন্যদিকে পরবর্তী পুলিশি বয়ানে বলা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ঘটেছে।
অর্থাৎ তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়:
মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
শরীরের তাপমাত্রা, রিগর মর্টিস, পচন, পাকস্থলীর উপাদান কিংবা অন্যান্য ফরেনসিক আলামত কী বলছে?
যদি ময়নাতদন্ত এখনো চূড়ান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনাকে পুলিশ কীসের ভিত্তিতে নিশ্চিত করছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া সময়ের রেখাটি পুরোপুরি পরিষ্কার হচ্ছে না।
তৃতীয় প্রশ্ন: দুই যুবক কীভাবে বাড়ির ছাদে উঠল?
পুলিশ বলছে, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন এবং সেখানে ইয়াবা সেবন করছিলেন।
এটি সত্য হলে ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের মাধ্যমে খুব সহজেই কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সম্ভব:
- পাশের ভবন থেকে ওই ছাদে ওঠার বাস্তব পথটি কী?
- সেখানে দেয়াল বা গেট টপকাতে হয় কি না?
- ওই পথটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত কি না?
- আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিলো কি?
- দুই যুবককে ওই পথে যাওয়ার কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে কি?
- তাদের মোবাইল ফোনের লোকেশন কী বলছে?
- ঘটনাস্থল থেকে তাদের ডিএনএ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে কি?
এগুলো শুধু পুলিশের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি নয়— পুলিশের বক্তব্য যাচাই করার প্রশ্ন।

চতুর্থ প্রশ্ন: চারজনকে হত্যার ঘটনাক্রমটি ফরেনসিক আলামতের সঙ্গে মেলে কি?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী প্রথমে গণপতি চক্রবর্তী, পরে তার স্ত্রী, মেয়ে এবং শেষে ছেলেকে হত্যা করা হয়। মেয়েকে কয়েক মিনিট চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না— এমন দাবিও সংবাদ সম্মেলনে এসেছে।
কিন্তু এই ঘটনাক্রমের ফরেনসিক প্রমাণ কী?
কার শরীরে আগে আঘাতের চিহ্ন?
কার মৃত্যুর সময় আগে?
কার শরীরে কার ডিএনএ?
গলায় ব্যবহৃত গামছা বা দড়িতে কার আঙুলের ছাপ?
রক্ত, ত্বকের কোষ, চুল বা অন্য কোনো জৈবিক নমুনা পাওয়া গেছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া পুলিশের বর্ণনাটি মূলত একটি তদন্ত-তত্ত্ব— চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

পঞ্চম প্রশ্ন: ১২ বছরের শিশুকে কেন হত্যা করা হলো— এটি কি কেবল অনুমান?
পুলিশ বলছে, ছেলে প্রিয়ম হত্যাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করে দিতে পারে— এই আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। কিন্তু প্রশ্ন হলো— পুলিশ কি কোনো প্রমাণ পেয়েছে যে শিশুটি হত্যাকারীদের দেখেছিলো?
যদি দেখে থাকে, সেটি কীভাবে জানা গেল?
হত্যাকারীরা কি জিজ্ঞাসাবাদে এমন কথা বলেছে?
নাকি এটি তদন্তকারীদের অনুমান?
একটি শিশুকে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি, ফরেনসিক আলামত ও ঘটনাস্থলের পুনর্গঠন— তিনটি আলাদা স্তরের প্রমাণ প্রয়োজন।

ষষ্ঠ প্রশ্ন: হত্যার পর খুনিরা গোসল করল, খাবার খেল, আবার ইয়াবা খেল —এই বয়ানের প্রমাণ কী?
সংবাদমাধ্যমে এখন ব্যাপকভাবে ছাপা হচ্ছে— হত্যার পর অভিযুক্তরা ওই বাড়িতেই গোসল করে, খেজুর ও শসা খায় এবং আবার ইয়াবা সেবন করে।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত:
বাথরুমে তাদের উপস্থিতির ফরেনসিক প্রমাণ কী?
খাবারে তাদের ডিএনএ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে?
ইয়াবা সেবনের কোনো আলামত পাওয়া গেছে?
বাথরুম, রান্নাঘর বা খাবারের পাত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে?
যদি হয়ে থাকে, পরীক্ষার ফল কী?
এসব তথ্য ছাড়া ভয়াবহ এই বর্ণনা পাঠকের কাছে চমক তৈরি করে, কিন্তু তদন্তের সত্যতা যাচাই করে না।

সপ্তম প্রশ্ন: চারটি ফোন বন্ধ হওয়ার রহস্য কী?
প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসেছে, পরিবারের চার সদস্যের ফোনই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ফরেনসিক সূত্র হতে পারে।
চারটি ফোন কখন শেষবার নেটওয়ার্কে ছিলো?
কোন টাওয়ারে ছিলো?
ফোনগুলো কি ঘটনাস্থলেই ছিলো?
কারও ফোন থেকে কোনো কল, এসএমএস, মেসেঞ্জার বা ইন্টারনেট কার্যক্রম হয়েছিলো?
অভিযুক্ত দুই যুবকের ফোনের লোকেশন কি একই সময় ওই এলাকায় পাওয়া যায়?
এগুলো জানা গেলে পুলিশের বয়ান শক্তিশালীও হতে পারে, আবার প্রশ্নবিদ্ধও হতে পারে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদে এসব তথ্যের বিস্তারিত দেখা যাচ্ছে না।

তাহলে সংবাদমাধ্যমের সমস্যা কোথায়?
সমস্যাটি হলো— অনেক প্রতিবেদনে “পুলিশ বলেছে” এবং “ঘটনা ঘটেছে”— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।
শিরোনাম হচ্ছে— ‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় চার খুন।’
কিন্তু সাংবাদিকের ভাষা হওয়া উচিৎ ছিলো—
‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার কারণ দাবি পুলিশের।’
দু’টি বাক্যের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য মনে হলেও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পার্থক্যটি বিশাল।
কারণ আদালতে অপরাধ প্রমাণের আগে পুলিশের বক্তব্য কোনো রায় নয়।

পুলিশের তদন্তকে অবিশ্বাস নয়, যাচাই করাই সাংবাদিকতার কাজ
এই ঘটনায় পুলিশ দ্রুত দুইজনকে আটক করেছে— এটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পুলিশের বয়ান সত্যও হতে পারে।
কিন্তু সত্য হলে সেটি ফরেনসিক প্রমাণে আরও শক্তিশালী হওয়ার কথা।
সাংবাদিকতার কাজ পুলিশের তদন্তকে অস্বীকার করা নয়; বরং পুলিশ যে দাবি করছে, তার সঙ্গে ঘটনাস্থল, ময়নাতদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক, সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শী ও আলামতের মিল খুঁজে বের করা।
রংপুরের চারটি প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই তদন্তের প্রতিটি তথ্য তাই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া উচিৎ।
কারণ আজ যদি পুলিশি বয়ানই পুরো সংবাদ হয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল কোনো তদন্তে পুলিশের প্রথম ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে সেই ভুলের দায় কে নেবে?
রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের আসল প্রশ্ন তাই শুধু ‘খুনি কারা?’ নয়।
আরও বড় প্রশ্ন—
পুলিশ যে গল্পটি বলছে, তার প্রতিটি অংশের পেছনে প্রমাণ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে ‘রহস্য উদ্ঘাটিত’ বলা হয়তো সাংবাদিকতার জন্য একটু তাড়াহুড়োই হবে।
