Headlines

রাজস্ব কর্মকর্তা পীযুষ কুমার বিশ্বাস ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাইফুল করীমের বক্তব্য চাইতেই কল কেটে দিলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমস্ নিলাম সেল নিয়ে অনুসন্ধানে ফলোআপ নিউজ

সাইফুল করীম
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের নিলাম সেলকে কেন্দ্র করে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিলাম প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে গিয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ফলোআপ নিউজ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

ফলোআপ নিউজ জানিয়েছে, নিলাম সেল-সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা পীযুষ কুমার বিশ্বাস এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাইফুল করীমের সঙ্গে পৃথকভাবে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। সংবাদমাধ্যমের পরিচয় দেওয়ার পরপরই তারা কলটি কেটে দেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাদের মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

কাস্টমস নিলাম সেল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, যেখানে জব্দকৃত, পরিত্যক্ত বা দীর্ঘদিন খালাস না হওয়া আমদানি পণ্য উন্মুক্ত বা ই-নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এসব পণ্যের মধ্যে ইলেকট্রনিকস, কাপড়, কেমিক্যাল, যন্ত্রাংশ, ভোক্তা পণ্যসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন সামগ্রী থাকতে পারে। ফলে নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানে নিলাম ব্যবস্থার কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের বর্ণনা ও শ্রেণি নির্ধারণে অসঙ্গতি, লটের প্রকৃত ওজন বা পরিমাণ কম দেখানোর অভিযোগ, বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম রিজার্ভ প্রাইস নির্ধারণ, সীমিত সংখ্যক অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সমঝোতার আশঙ্কা, ই-নিলামে প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং খালাস পর্যায়ে তদারকির ঘাটতি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় যখন মূল্যবান পণ্যকে কম মূল্যের পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এতে সাধারণ অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে ধারণা পান না এবং প্রতিযোগিতামূলক দর কমে যেতে পারে। একইভাবে লটের ওজন, পরিমাণ বা মান নিয়ে অসঙ্গতি থাকলে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

রিজার্ভ প্রাইস বা সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণও একটি সংবেদনশীল বিষয়। বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম মূল্য নির্ধারণ করা হলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুবিধা পেতে পারে। আবার ই-নিলাম ব্যবস্থায় সার্ভার, লগইন বা বিড সাবমিশন সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময় উঠে আসে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান। অতীতে কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, গুদামজাত পণ্য, মূল্যায়ন এবং নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে গণমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বর্তমান নিলাম সেল বা উল্লিখিত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ আদালত বা সরকারিভাবে প্রমাণিত হয়েছে— এমন তথ্য এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। গড়পড়তা অভিযোগ, তারপরও সংবাদমাধ্যমের নাম শুনতেই কেনো এই দুই কর্মকর্তা এড়িয়ে যেতে চাইছেন?

রাজস্ব প্রশাসন ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিলাম প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইনভেন্টরি, স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি, রিয়েল-টাইম ই-নিলাম মনিটরিং, অংশগ্রহণকারীদের তথ্য সুরক্ষা, নিলাম-পরবর্তী অডিট এবং ডেলিভারি পর্যায়ে ভিডিওভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো লিখিত বা মৌখিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে। তবে রাজস্ব কর্মকর্তা পীযুষ কুমার বিশ্বাসের অসদাচরণ বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার প্রভাত কুমার সিংহ-এর সাথে আলোচনা করেছে ফলোআপ নিউজ। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টমস্ হাউস
নিলাম প্রক্রিয়া। ২য় এবং ৩য় ধাপ দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কতগুলো নিলামের তথ্যঃ

১. বিশেষ ই-নিলাম নং ০৮/২০২৬ (জুলাই ২০২৬): জুলাই মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম কাস্টমস মোট ১৬৮টি কনটেইনারের পণ্য অনলাইন নিলামে তোলে। এগুলোকে মোট ৭৬টি লটে ভাগ করা হয়েছিল। এই নিলামের বিশেষত্ব ছিল এতে কোনো ‘সংরক্ষিত মূল্য’ বা রিজার্ভ প্রাইস রাখা হয়নি, ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বিডিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতারা পণ্য কেনার সুযোগ পান। নিলামকৃত পণ্যের মধ্যে ছিল কেমিক্যাল, তৈরি পোশাকের ফেব্রিক্স, পেপার প্রোডাক্টস, বিটুমিন, ফ্রিজার এবং ভারী যন্ত্রপাতি।

২. ই-নিলাম নং ০৬/২০২৬ (জুন ২০২৬): জুন মাসের মাঝামাঝিতে (১৮ জুন দরপত্র বাক্স উন্মুক্ত করার মাধ্যমে) ১০২ কনটেইনার পণ্য অনলাইন নিলামে বিক্রি করা হয়। এই চালানে জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, কোয়ার্টজ পাউডার ও বিভিন্ন মেটাল স্ক্র্যাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

৩. ই-নিলাম নং ০২/২০২৬ এবং ০৩/২০২৬ (মার্চ-এপ্রিল ২০২৬): মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস তাদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করে, যেখানে মোট ৩৭৮টি কনটেইনারের পণ্য (১২৩টি লটে) বিক্রি করা হয়। এতে ক্যাপিটাল মেশিনারি, যাত্রীবাহী লিফট, প্লাস্টিক স্ক্র্যাপ এবং গাড়ির পার্টস বিক্রি করা হয়।