Headlines

গবেষণার নামে প্রহসনঃ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি জ্ঞান উৎপাদন করছে, নাকি কাগজের পাহাড় বানাচ্ছে?

গবেষণা চুরি

FollowUpNews।। ডেস্ক


গবেষণাকে উচ্চশিক্ষার প্রাণ বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং, বিদেশি অনুদান—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে গবেষণা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, ভুয়া রিভিউ, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি এবং সন্দেহজনক প্রকাশনা নিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।


চৌর্যবৃত্তি

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৩২৫টি প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে জার্নালগুলো তথ্যের অসংগতি, প্ল্যাজিয়ারিজম, ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নসহ বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল কয়েকজন গবেষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।

“Publish or perish” সংস্কৃতির বিকৃত রূপ

বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একটি অদ্ভুত চাপ কাজ করে— প্রকাশ করো, না হলে পিছিয়ে পড়ো। শিক্ষক নিয়োগ, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, তারপর অধ্যাপক— প্রতিটি ধাপে গবেষণাপত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আর থাকে না “গবেষণাটি নতুন কী জ্ঞান দিচ্ছে?”; বরং হয়ে দাঁড়ায় “আরেকটি পেপার কোথায় ছাপানো যাবে?”

এই সংখ্যাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গবেষণাকে জ্ঞানচর্চা থেকে সরিয়ে কাগজ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত করেছে। বিশেষ করে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং ও প্রচারণার জন্য গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতা স্পষ্ট। সব প্রতিষ্ঠানকে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে, কারণ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মানসম্মত গবেষণা হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে সংখ্যাকে মানের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।

টাকা দিলেই গবেষণা?

বাংলাদেশের গবেষকসমাজে এখন একটি বহুল আলোচিত শব্দ—“পে-টু-পাবলিশ”। সব ওপেন-অ্যাকসেস জার্নাল খারাপ নয়; বিশ্বের বহু সেরা জার্নালও প্রকাশনা ফি নেয়। সমস্যা হলো, একদল সন্দেহজনক জার্নাল গবেষণার কঠোর মূল্যায়ন ছাড়াই টাকা নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করে। অনেক শিক্ষক ও গবেষক দ্রুত প্রকাশনার জন্য এসব জার্নালের দিকে ঝুঁকছেন।

ফলে যা হচ্ছেঃ

  • দুর্বল গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে,

  • একই ধরনের তথ্য বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে,

  • পরিসংখ্যানগত ত্রুটি ধরা পড়ছে না,

  • গবেষণার পুনরুত্পাদনযোগ্যতা (reproducibility) অনিশ্চিত থাকছে।

ভুয়া রিভিউ ও “বন্ধু নেটওয়ার্ক”

আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণা প্রত্যাহারের একটি বড় কারণ হলো peer review manipulation। কিছু ক্ষেত্রে লেখক নিজের পরিচিত ব্যক্তিকে রিভিউয়ার হিসেবে সুপারিশ করেন, কখনো ভুয়া ই-মেইল ব্যবহার করে নিজেই রিভিউ দেন— এমন অভিযোগ বিশ্বজুড়েই উঠেছে। বাংলাদেশও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়।

যদি গবেষণার মান যাচাইয়ের প্রধান দরজাটিই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে পুরো একাডেমিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গবেষণার উদ্দেশ্য কোথায়?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরে হাজার হাজার গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব গবেষণার কতগুলো দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগে?

বিজ্ঞানের বাইরে আমাদের জরুরি গবেষণার ক্ষেত্রগুলো কী? দুঃখজনকভাবে, অনেক গবেষণাই এমন বিষয়ে করা হয় যা আন্তর্জাতিক জার্নালে তুলনামূলক সহজে প্রকাশযোগ্য, কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণ বা সমাজের জন্য খুব কম প্রাসঙ্গিক।

“বিশ্বসেরা গবেষক” হওয়ার প্রতিযোগিতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে citation, h-index, Scopus, Web of Science ইত্যাদি সূচককে ঘিরে এক ধরনের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং তৈরি হয়েছে। গবেষণা একটি সমষ্টিগত জ্ঞানচর্চা হলেও অনেক সময় এটি ব্যক্তিগত খ্যাতির প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “বিশ্বের শীর্ষ গবেষক”, “টপ ২% scientist” ইত্যাদি পরিচয় প্রচার করা হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষ খুব কমই জানেন এসব তালিকার পদ্ধতি কী, সীমাবদ্ধতা কী, আর গবেষণার প্রকৃত প্রভাব কতটা।

উচ্চ citation মানেই উচ্চ মানের গবেষণা— এ ধারণাও সবসময় সঠিক নয়।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কি ভালো অবস্থায়?

শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করলে বাস্তবতা ধরা পড়বে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও রয়েছেঃ

  • রাজনৈতিক প্রভাব;

  • গবেষণার অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহার;

  • ল্যাবের দুর্বল অবস্থা;

  • দীর্ঘসূত্রতা;

  • গবেষণা সহকারীর অভাব;

  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা।

অনেক শিক্ষক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তাদের পক্ষে অনুকূল নয়।

গবেষণা প্রত্যাহার সবসময় কি অপরাধ?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য দরকার। আন্তর্জাতিক একাডেমিক জগতে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (retraction) কখনো কখনো বিজ্ঞানের আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। সৎ ভুল, তথ্যগত ত্রুটি বা পরে আবিষ্কৃত সমস্যার কারণেও পেপার প্রত্যাহার হতে পারে। তাই প্রত্যেক প্রত্যাহারকে সরাসরি জালিয়াতি বলা ঠিক নয়। তবে যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অনিয়ম, ভুয়া রিভিউ, প্ল্যাজিয়ারিজম, তথ্য বিকৃতি দেখা যায়, তখন তা অবশ্যই গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

সমাধান কী?

বাংলাদেশে গবেষণার মান উন্নত করতে কয়েকটি কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি।

১. সংখ্যার বদলে মান

পদোন্নতিতে শুধু পেপারের সংখ্যা নয়, গবেষণার প্রভাব, উদ্ধৃতি, তথ্যের স্বচ্ছতা ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা মূল্যায়ন করতে হবে।

২. জাতীয় গবেষণা সততা কমিশন

Research Integrity Office বা স্বাধীন তদন্ত কাঠামো গঠন প্রয়োজন।

৩. বাধ্যতামূলক প্ল্যাজিয়ারিজম ও ডেটা অডিট

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত যাচাই করতে হবে।

৪. ওপেন ডেটা সংস্কৃতি

যেখানে সম্ভব, গবেষণার তেটা উন্মুক্ত করতে হবে।

৫. স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক গবেষণা তহবিল

জলবায়ু, স্বাস্থ্য, কৃষি, নগরায়ণ ইত্যাদি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনুদান দরকার।

৬. গবেষণা পদ্ধতি শেখানো

অনেক শিক্ষকই বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন, কিন্তু আধুনিক গবেষণা নকশা, পরিসংখ্যান ও নৈতিকতা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না।


বাংলাদেশে গবেষণার সংকট আসলে নৈতিকতার সংকট, প্রণোদনার সংকট এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছি যেখানে দ্রুত প্রকাশনা পুরস্কৃত হয়, গভীর চিন্তা নয়; সংখ্যা মূল্য পায়, সত্য নয়; র‌্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ।

তবু আশার জায়গা আছে। দেশে অনেক সৎ, পরিশ্রমী ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষক আছেন, যারা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। প্রয়োজন হলো তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা এবং গবেষণাকে আবারও “ক্যারিয়ার টোকেন” থেকে “জ্ঞান ও জনকল্যাণের উপকরণে” পরিণত করা।

গবেষণার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কেবল আরেকটি পেপার নয়; বরং এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা মানুষের জীবন, নীতি ও ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই দায়িত্ব পালন করবে, নাকি কেবল কাগজের পাহাড় বানাবে— এ প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজতে হবে।